লালবাগ কেল্লার অন্ধকার প্রবেশপথ: ইট-পাথরের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা ইতিহাসের প্রশ্ন

লালবাগ কেল্লার গোপন সুড়ঙ্গের ছবি
লেখা ও সরেজমিন পর্যবেক্ষণ:Md Mahamudul Hasan 
ঢাকার পুরান শহরে দাঁড়িয়ে থাকা লালবাগ কেল্লা শুধু মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন নয়; এটি এমন এক ইতিহাসের সাক্ষী, যার সব প্রশ্নের উত্তর আজও আমাদের জানা নেই। এর প্রাচীর, দরবার হল, মসজিদ ও পরীবিবির সমাধি দর্শনার্থীদের সামনে মুঘল বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরে। কিন্তু এই দৃশ্যমান স্থাপনার বাইরেও রয়েছে কিছু অন্ধকার প্রবেশপথ, যেগুলোকে ঘিরে জন্ম নিয়েছে বহু প্রশ্ন, জনশ্রুতি ও রহস্য।

সম্প্রতি লালবাগ কেল্লা পরিদর্শনের সময় একটি পুরোনো দেয়ালের নিচের দিকে থাকা অন্ধকার প্রবেশপথ চোখে পড়ে। ক্ষয়প্রাপ্ত দেয়াল, ছোট বন্ধ খোপ এবং নিচের দিকে নেমে যাওয়া বলে মনে হওয়া অন্ধকার অংশটি স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল সৃষ্টি করে। এটি কি কোনো ভূগর্ভস্থ কক্ষের প্রবেশপথ? এটি কি দুর্গের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ? নাকি কোনো পুরোনো স্থাপনার অবশিষ্ট কাঠামো?

শুধু একটি ছবি দেখে এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্নগুলোই আমাদের নিয়ে যেতে পারে লালবাগ কেল্লার বিস্মৃত স্থাপত্য-ইতিহাসের গভীরে।

একটি দুর্গ, যার পরিকল্পনা কখনো পূর্ণতা পায়নি

১৬৭৮ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ আজম শাহ ঢাকায় এই দুর্গের নির্মাণ শুরু করেন। তখন এর নাম ছিল কেল্লা আওরঙ্গবাদ। উদ্দেশ্য ছিল বাংলার সুবাদারের জন্য রাজকীয় আবাস, প্রশাসনিক কেন্দ্র ও নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থাপনা গড়ে তোলা।

কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আজম শাহের ঢাকা ত্যাগ এবং পরবর্তীকালে শায়েস্তা খাঁর কন্যা পরীবিবির মৃত্যুর সঙ্গে দুর্গটির অসমাপ্ত ইতিহাস জড়িয়ে যায়। এর ফলে যে স্থাপত্যপরিকল্পনা হয়তো আরও বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল, তা পূর্ণতা পায়নি।

বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং ঐতিহাসিক গবেষণায় দুর্গের প্রাচীর, বুরুজ, পানি সরবরাহব্যবস্থা, বাগান, দরবার হল ও অন্যান্য স্থাপনার উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ এর প্রতিটি অংশকে আলাদা করে নয়, বরং একটি সমন্বিত রাজকীয় ও প্রতিরক্ষামূলক কমপ্লেক্স হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

অন্ধকার প্রবেশপথটি কীসের?

লালবাগ কেল্লার দক্ষিণের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের সঙ্গে একাধিক বুরুজ যুক্ত ছিল। দুর্গের এসব বুরুজের সঙ্গে সুড়ঙ্গ বা নিচু পথের উল্লেখও বিভিন্ন বিবরণে পাওয়া যায়।

মুঘল আমলের একটি দুর্গে এমন পথের উপস্থিতি অস্বাভাবিক নয়। প্রতিরক্ষামূলক স্থাপত্যে সৈন্যদের চলাচল, প্রাচীরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা কিংবা নিরাপত্তাসংক্রান্ত কাজে নিচু পথ বা কক্ষ ব্যবহার করা হতে পারে।

কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে: ছবিতে দেখা প্রবেশপথটি কি সেই পরিচিত ভূগর্ভস্থ পথগুলোর কোনো একটি?

এটি নিশ্চিত করতে হলে প্রবেশপথটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান, স্থাপত্যের ধরন, দেয়ালের গঠন এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নথির সঙ্গে তুলনা করতে হবে। কেবল অন্ধকার গর্ত বা নিচু দরজার উপস্থিতি থেকে একে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ ঘোষণা করা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

তবু এই দৃশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয়—ঐতিহাসিক স্থাপনার দৃশ্যমান অংশের পাশাপাশি তার নিচে বা দেয়ালের ভেতরে থাকা কাঠামোও অতীতকে বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বুড়িগঙ্গা থেকে জিঞ্জিরা: ইতিহাস, ভূগোল ও জনশ্রুতি

লালবাগ কেল্লার সুড়ঙ্গ নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত জনশ্রুতিগুলোর একটি হলো, কোনো কোনো ভূগর্ভস্থ পথ বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে জিঞ্জিরা দুর্গ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

এই কাহিনি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের কৌতূহল ধরে রেখেছে। কিন্তু একটি গল্প বহুদিন ধরে প্রচলিত থাকলেই সেটি প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় না।

ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নদীর গতিপথ। ইউনেসকোর সম্ভাব্য বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় লালবাগ কেল্লার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, একসময় বুড়িগঙ্গা দুর্গের অনেক কাছে প্রবাহিত হতো; পরবর্তীকালে নদী দক্ষিণ দিকে সরে গেছে।

অতএব, অতীতের নদী ও দুর্গের ভৌগোলিক সম্পর্ক বোঝার জন্য ঐতিহাসিক মানচিত্র, পুরোনো চিত্রকর্ম এবং ভূপ্রকৃতির পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা জরুরি।

তবে নদী কাছাকাছি ছিল—এই তথ্য একাই প্রমাণ করে না যে কেল্লার সুড়ঙ্গ নদীর তলদেশ দিয়ে জিঞ্জিরা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ প্রয়োজন।

রহস্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গবেষণার অভাব

ঐতিহাসিক স্থাপনাকে ঘিরে রহস্য মানুষের আগ্রহ বাড়ায়। কিন্তু রহস্যের প্রকৃত মূল্য তখনই, যখন তা অনুসন্ধানের নতুন পথ তৈরি করে।

লালবাগ কেল্লার অন্ধকার প্রবেশপথের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রবেশপথটি কোথায় অবস্থিত, এর ভেতরে কী ধরনের কাঠামো রয়েছে, এটি কতটা গভীর এবং অন্য কোনো স্থাপনার সঙ্গে এর সংযোগ আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, প্রমাণের মাধ্যমে খুঁজতে হবে।

এ জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণ নথি পর্যালোচনা, স্থাপত্যের বিস্তারিত জরিপ, ঐতিহাসিক মানচিত্রের তুলনা এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে ভূগর্ভস্থ অনুসন্ধান করা যেতে পারে।

এ ধরনের অনুসন্ধানে ঐতিহাসিক স্থাপনার কোনো ক্ষতি করা যাবে না। অনুমোদন ছাড়া প্রবেশপথে নামা বা খনন করাও নিরাপদ নয়।

আমাদের সামনে যে প্রশ্নটি রয়ে যায়

লালবাগ কেল্লা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্ন রেখে গেছে: আমরা কি শুধু দৃশ্যমান স্থাপত্য সংরক্ষণ করছি, নাকি এর নির্মাণপরিকল্পনা, ব্যবহার ও পরিবর্তনের সম্পূর্ণ ইতিহাসও অনুসন্ধান করছি?

একটি পুরোনো প্রবেশপথ হয়তো কোনো গোপন সুড়ঙ্গ নয়। সেটি হতে পারে একটি কক্ষ, প্রতিরক্ষা কাঠামো কিংবা অন্য কোনো স্থাপত্যিক ব্যবস্থার অংশ। কিন্তু সেটি কী, তা জানার অধিকার কৌতূহলী মানুষের যেমন রয়েছে, তেমনি দায়িত্বশীল উত্তর দেওয়ার দায়িত্বও ইতিহাসচর্চা ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার।

লালবাগ কেল্লার প্রকৃত রহস্য হয়তো কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনা নয়। বরং কয়েক শতাব্দী ধরে টিকে থাকা একটি স্থাপনার কতটুকু আমরা জানি, কতটুকু জানি না এবং অজানা অংশগুলোকে জানার জন্য কতটা গবেষণা করেছি—সেই প্রশ্নেই এর গভীরতা।

ইতিহাসের অন্ধকার অংশকে রহস্য বলে থামিয়ে দেওয়া সহজ; কিন্তু প্রমাণের আলোয় তাকে বোঝার চেষ্টা করাই প্রকৃত অনুসন্ধান।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর; ইউনেসকোর “Mughal Forts on Fluvial Terrains in Dhaka” বিবরণ; লালবাগ কেল্লার সুড়ঙ্গ নিয়ে প্রকাশিত ঐতিহাসিক ও সংবাদভিত্তিক আলোচনা।

সম্পাদনাগত নোট: এই লেখাটি সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও বিদ্যমান ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে রচিত। ছবিতে দেখা প্রবেশপথটির সুনির্দিষ্ট পরিচয় এবং সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিক্ষা না কোচিং: আমরা কোন পথে হাঁটছি?

দল নয়, মানুষ: একটি দলনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন

কাজের কৃতিত্ব: ব্যক্তি না প্রতিষ্ঠান?