শিক্ষা না কোচিং: আমরা কোন পথে হাঁটছি?
মাননীয় স্পিকার,
আজ স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে রাস্তার পাশে বড় বড় কিছু সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। সেগুলো সবই গার্লস ও বয়েজ স্কুলে ভর্তি কোচিংয়ের বিজ্ঞাপন। দৃশ্যটি নতুন কিছু নয়, কিন্তু বারবার চোখে পড়লে প্রশ্ন জাগে—আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি?
কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছি, ক্লাসের মেধাবী কিছু শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে আসছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তারা স্কুল সময়েই কোচিংয়ে ব্যস্ত। বিষয়টি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গভীর সংকটের প্রতিফলন।
আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে বিদ্যালয় বা কলেজের পাঠদান যেন ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে—শিক্ষার মূল চাবিকাঠি এখন আর বিদ্যালয়ে নয়, বরং কোচিং সেন্টারের হাতে। সেখানে অল্প সময়ে, সীমিত পরিসরে, “পরীক্ষায় আসবে”—এমন কিছু নির্দিষ্ট অংশ পড়িয়ে ভালো ফলাফলের নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। ফলে পুরো বই পড়া, বিষয়বস্তুকে গভীরভাবে বোঝা বা সৃজনশীল চিন্তার চর্চা—এসব যেন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে।
এই প্রবণতা আমাদের জন্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে আমরা একই চক্রের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি। গতানুগতিক শিক্ষা পদ্ধতি, পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়ন এবং ফলাফলকেন্দ্রিক মানসিকতা—সব মিলিয়ে আমরা এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছি, যেখানে প্রকৃত শিক্ষা নয়, বরং “ফলাফল” হয়ে উঠেছে একমাত্র লক্ষ্য।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যতের যে প্রজন্ম তৈরি করছি, তারা কতটা প্রস্তুত একটি প্রতিযোগিতামূলক, দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে? কেবল কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে কি একজন দক্ষ ডাক্তার, প্রকৌশলী বা গবেষক হওয়া সম্ভব?
বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনো তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তনের ছাপ দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, আধুনিক প্রশিক্ষণ কিংবা সৃজনশীল শিক্ষণ পদ্ধতি—এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। ফলে অনেক শিক্ষকই বাধ্য হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে কোচিং বা প্রাইভেট নির্ভর হয়ে পড়ছেন, যা পুরো ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং সৃজনশীলতার উপর। শিক্ষাকে তারা কেবল পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।
আমাদেরও সেই পথেই হাঁটতে হবে।
প্রথমত, শিক্ষকদের আধুনিক ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পাঠদান পদ্ধতিকে করতে হবে আরও আকর্ষণীয় ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক।
তৃতীয়ত, পরীক্ষার চাপ কমিয়ে শিক্ষাকে আনন্দময় করে তুলতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষকরা আর্থিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হবেন না।
শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার ভিত্তি। যদি আমরা এখনই এই সংকটকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা না করি, তবে খুব শিগগিরই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বড় ধরনের ধাক্কার সম্মুখীন হবে।
সময় এসেছে, আমরা নতুন করে ভাবি—শিক্ষা কি সত্যিই আমাদের অগ্রগতির পথ দেখাচ্ছে, নাকি আমরা অজান্তেই সেটিকে একটি ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত করছি?
লেখকঃ এম. মাহামুদুল হাসান

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান কমেন্টের জন্য ধন্যবাদ