কাজের কৃতিত্ব: ব্যক্তি না প্রতিষ্ঠান?

 

আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত প্রবণতা হলো—রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কোনো উন্নয়ন কাজ হলে সেটিকে একজন ব্যক্তি, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতার কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরা। কিন্তু বাস্তবতা বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হবে একটি কাজ আসলে কীভাবে সম্পন্ন হয়।

প্রথমে একটি সহজ উদাহরণ ধরা যাক। কোনো স্কুলে যদি নতুন একটি ভবন নির্মাণ করা হয়, সেটি কি শুধুই প্রধান শিক্ষকের কাজ? না। অর্থ আসে প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে, পরিকল্পনায় যুক্ত থাকেন শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটি, কাজ বাস্তবায়ন করেন প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা। প্রধান শিক্ষক এখানে দায়িত্ব পালন করেন, তদারকি করেন, নেতৃত্ব দেন—কিন্তু পুরো কাজটি তাঁর একার নয়। তাই সঠিকভাবে বলা উচিত, এটি প্রতিষ্ঠানের কাজ, যা তাঁর নেতৃত্বে সম্পন্ন হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও একই কাঠামো কাজ করে। যেমন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সরকারের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু একটি সেতু, রাস্তা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, শ্রমিক এবং সর্বোপরি জনগণের অর্থায়নে। অর্থাৎ, এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া—একজন ব্যক্তির একক প্রচেষ্টার ফল নয়।

প্রশাসনিক কাঠামোতে এই বিষয়টি তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্ট। যেমন একজন জেলা প্রশাসক কোনো উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করলে সাধারণত সেটি “জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এখানে পদ ও প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, ব্যক্তিকে নয়। এর ফলে প্রশাসনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং কাজ ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে না।

অন্যদিকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়, উন্নয়ন কাজকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। এতে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয় যে রাষ্ট্রের সব অর্জন একজন ব্যক্তির অবদান। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। কারণ এতে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, অন্যদের অবদান আড়াল হয় এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তরুণদের জন্য এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। কোনো বড় কাজকে বোঝার সময় শুধু সামনে থাকা ব্যক্তিকে নয়, পুরো ব্যবস্থাটিকে দেখতে হবে। নেতৃত্ব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নেতৃত্ব একা কিছু করতে পারে না—তার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ মানুষ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা।

সুতরাং, একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত: উন্নয়ন কাজের মূল কৃতিত্ব রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের, আর সংশ্লিষ্ট নেতা বা কর্মকর্তার কৃতিত্ব তাঁর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন ও কার্যকর নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে আমরা ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দিতে শিখব—যা একটি শক্তিশালী ও টেকসই রাষ্ট্র গঠনের জন্য অপরিহার্য।

-এম. মাহামুদুল হাসান

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দল নয়, মানুষ: একটি দলনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন

বৃত্তি পরীক্ষা ও শিশুর অধিকার: বৈষম্যের বিপরীতে যুক্তির ভাষা

শিক্ষা না কোচিং: আমরা কোন পথে হাঁটছি?