একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার অজানা গল্প
আমাদের গ্রামের নাম পীরপুর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য
মন্ডিত একটি গ্রাম। সেই গ্রামের একজন সূর্য সন্তানের গল্প বলছি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিকে আমাদের গ্রামের সব তরুণদের মতো তিনিও গ্রাম পাহারা দিতেন। গ্রামে তৎকালীন সময়ে বাম রাজনীতির ঘাঁটি ছিল। সেখানে গোপনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হতো। যা পাকিস্তান সরকার জানতো। ফলে গ্রামে প্রায় সময়ই পাকিস্তানিরা হামলা করতো এবং সাধারন মানুষকে নির্যাতন করত। এসব দেখে সেই মুক্তিসেনা শুধু গ্রাম পাহারায়ই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন নি। চেয়েছিলেন লড়াই করে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে। এছাড়াও একটি বিষয় তিনি সর্বদা ভাবতেন। তিনি মনে করতেন তাঁর চেয়ে যারা দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারীরা যদি যুদ্ধ করতে পারে, তাহলে সে কেন পারবে না? তিনি ও সংকল্প করলেন যুদ্ধে যাবেন। তারপর তিনি তাঁর ভাবনার কথা তাঁর বাবা কে জানান, বাবা রাজি হলেন। বাবার সম্মতিক্রমে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৭১ সালের ১৪ জুন তিনি ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ওখানে গিয়ে তিনি সর্বপ্রথম বামদের একটি ঘাঁটি (গ্রাফস হোস্টেল ) আগরতলায় যান। সেখান থেকে যান ছাত্র ইউনিয়ন ক্যাম্প বরদোয়ালি। বরদোয়ালি থেকে তখনকার অগ্নিকন্যা বেগম মতিয়া চৌধুরী এবং পঙ্কজ ভট্টাচার্যের সহায়তায় কংগ্রেস ভবনে নাম লেখান। দুইদিন পর সেখান থেকে বিজনা নামক স্থানে ইউথ ক্যাম্পে যান। ক্যাম্পে দুইদিন থাকার পর রিক্রুট হন অম্পিনগর ট্রেনিং সেন্টারে। ট্রেনিং করার পর আমতলী খ্রি সেক্টরের হেডকোয়াটারে আসেন। সে রাতেও সেখানে পাকিস্তানিদের গোলাবর্ষণ হয়। তারপর সেখান থেকে সকালবেলা তিনি এবং তাঁর সহযোদ্ধারা ক্যাম্প গুটিয়ে অন্যত্র ঘাঁটি স্থাপন করেন। যার নাম ছিলো হেজামারা। হেজামারা থেকে তাঁকে সিলেট রণাঙ্গনে পাঠানো হয়। সেখানে বাঙ্কারে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তিনি ডিফেন্সে ছিলেন এবং যুদ্ধের সময় টপসের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন যাকে টুয়াইছিস বলে। মূলত: ডিসেম্বরের ৩ তারিখ তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। তিনি দুইবার পাকিস্তানিদের কবলে পড়েন। তবে তিনি তাঁর সাহস ও বুদ্ধি খাটিয়ে তাদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করেন। অসীম সাহসের সাথে যুদ্ধ করার পরে ৭ তারিখে তাদের সিলেট রণাঙ্গন থেকে উইথড্র হয়ে সেখানে ২ দিন থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ১৬ তারিখে সকল মুক্তিযোদ্ধারা একত্রিত হয় এবং ইতোমধ্যেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পন করে। এ ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধাদের বুক গর্বে ভরে ওঠে। একজন জীবিত সেনা হিসেবে দেশকে স্বাধীন করার আনন্দে তিনি গর্বিত হয়ে ওঠেন। আমাদের গ্রামের সকল মানুষই তাঁর উপর চির কৃতজ্ঞ। কারণ তিনি অনেক বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে আমাদের দেশকে শত্রুমুক্ত করেছেন। এবং আমিও তাঁর উপর চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকবো। এতক্ষন যার গল্প বললাম তিনি আর কেউ নন তিনি আমার প্রিয় নানা ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন।
গল্পটি লিখেছেন:
নুসরাত জাহান তানহা
৬ষ্ঠ শ্রেণি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন