যুদ্ধ নয় শান্তি চাই, শিশুর বাসযোগ্য পৃথিবী চাই
যারা আজ পৃথিবীতে শান্তির কথা বলে তারাই ঘুরেফিরে যুদ্ধ সংঘাতে বেশি জড়িয়ে থাকে। আমাদের সমৃদ্ধি যত বেড়ে চলছে ততই সহিংসতা চরম মাত্রায় পৌঁছে যাচ্ছে। পৃথিবীর পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্রগুলো তাদের শক্তির মহড়ায় বরাবরই ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পৃথিবীর আদিতে যখন মানুষ গুহায় বসবাস করত তখন থেকে শুরু করে আজ অবধি মানুষের চারিত্রিক কোন পরিবর্তন হয়নি। কেবল বাহিরের লোমশ অংশগুলো লোমহীন হয়েছে, গাছপালার পাতা, বাকলের পরিবর্তে কেবল কোট টাই আর দামী পোষাকে আবৃত করেছে নিজেকে। শিশুর বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য আমরা যতই গলা ফাটাই, কর্তা দেশগুলো এ ব্যাপারে একেবারেই নির্বিকার। তাদের অহমিকা, ক্ষমতার লড়াই, সম্রাজ্যবাদ আমাদের শিশুদের তৈরি করছে ভীত আর সন্ত্রস্ত। যুগের পর যুগ যুদ্ধ সংঘাত আর বিভীষিকাময় পরিবেশ শিশুদের মনোজগতে আঘাত হানছে বারংবার। এ যুদ্ধ সংঘাত শেষ হবে কি কখনো? গত কয়েকযুগে এ পৃথিবী কখনো কি ছিল সংঘাতহীন? একটি যুদ্ধ শেষ হতে না হতে আরেকটি যুদ্ধ হাজির। প্রতিনিয়ত পৃথিবীর কোন না কোন প্রান্তে যুদ্ধ লেগেই আছে। যত দিন যাচ্ছে যুদ্ধে লিপ্ত দেশের সংখ্যা বেড়েই চলছে। আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে শুরু হয়েছিল ফিলিস্তিন ইসরাইল যুদ্ধ। রাশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে বারংবার। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া এসব দেশের যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছে। ঘর বাড়ি ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে জীবন যাপন করছে আরও কয়েক গুন নারী,পুরুষ, শিশু সহ সব ধরনের মানুষ।এদের প্রতিটি পরিবারের শিশুরা একটি বিভীষিকা নিয়ে বেড়ে উঠছে। শিশুর নিরাপত্তাহীনতায় এসব দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। শিশুরা তাদের বাসঅযোগ্য একটি বর্বর পৃথিবীতে বড় হচ্ছে।
আজকের শিশু আগামী দিনের পৃথিবী গড়বে। শিশুদের জন্ম, বেড়ে ওঠা, পড়ালেখা এসবে সুষ্ঠু নিরাপত্তা না দিতে পারলে শিশু হয়ে উঠবে আরও বেশি ভয়ংকর। আমরা নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন নিয়ে ভবছি, ভাবছি মহাবিশ্ব জয় করার নেশায়, তারচেয়েও গভীর ভাবে ভাবা দরকার আমাদের শিশুদের নিয়ে যারা আগামি পৃথিবীর হাল ধরবে।
বিশ্বের চিত্রের পাশাপাশি আমার সার্বভৌমত্বের অভ্যন্তরে শিশুরা কেমন আছে সেটাও জানার চেষ্টা করব। বিশ্বায়নের মাতাল ধারাবাহিকতায় এদেশে বেড়েছে বহুতল ভবন, বেড়েছে উন্নত রাস্তাঘাট, ব্রিজ সেই সাথে ক্ষীন হয়ে আসছে খেলার মাঠ। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলা ও সুস্থ্য সাংস্কৃতিক চর্চা অপরিসীম। যার অনুপস্থিতি আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।খেলাধুলার অভাবে স্থূলতা আর নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগেছে আমাদের শিশুরা। খেলাধুলার সুযোগ না থাকাতে অনলাইন আসক্তি কেড়ে নিচ্ছে তাদের আনন্দঘন শৈশব। দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সীমাহীন পুঁজিবাদ শিশুদের মধ্যে একটা বিশাল নেতিবাচক ছায়া ফেলছে। অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফলে শিশুদের শিক্ষা ও আনন্দ স্থলে এসেছে ব্যাপক পার্থক্য যা শিশু বিকাশে অত্যন্ত অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে হানাহানি, যুদ্ধাবস্থা শিশু অধিকার অনিশ্চিত করে দিচ্ছে বারংবার। বর্তমান যুদ্ধে শিশুরা যেভাবে বলিদান হচ্ছে সেখানে শিশুদের কাছে এ পৃথিবী একটা অসভ্য বাজে রাজ্যে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘ ঘোষিত শিশু অধিকার সনদে প্রত্যেক শিশুর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার রক্ষার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষা ও বিশুদ্ধ পানির নিরাপত্তার কথাও বলা হয়েছে। যে কোন প্রকার শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে স্পষ্ট অক্ষরে। শিশুরা তাদের স্বাধীন মতামত প্রকাশ করতে পারবে সে দিকটাও ঘোষিত হয়েছে। জাতিসংঘের ঘোষণা মতে যুদ্ধস্থলে শিশুদের অধিকারকে যেভাবে হাওয়ায় মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে তা আধুনিক সভ্যতায় বড়ই বেমানান। শিশুদের এবং আগামীর বাসযোগ্য পৃথিবীর কথা চিন্তা করে যুদ্ধকে না বলার বিকল্প কিছু নেই। যত দ্রুত আমরা যুদ্ধের পথ পরিহার করে শান্তির পতাকা উড়াতে পারবো তত দ্রুতই আমাদের পৃথিবী পরিনত হবে একটি সুন্দর বাসযোগ্য সুখের স্বর্গে। যেখানে শিশুর পদচরনায় মুখরিত হবে উত্তর থেকে দক্ষিন মেরু। শিশুর হাসিতে ভরে থাকবে শান্তির পুস্পরাজ্য।
লেখকঃ
অধ্যক্ষ এম. মাহামুদুল হাসান
সদস্য, খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটি।
খুব মূল্যবান কথা। ধন্যবাদ
উত্তরমুছুন