গল্প : বাকিটা রহস্য



বুক থেকে বিরাট একটা পাথর নেমে গেল। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। পুরো ডিসেম্বর কেবল মজা আর মজা। আমার নাম লিখন, ক্লাস সেভেনে পড়ি, মানে পড়তাম, এখন এইটে। স্কুল এবং কোচিংকে একমাসের ছুটি দিয়ে বাসায় ফিরছি। পেছন থেকে দৌড়ে এসে কে যেন কাঁধে ধরল।

রাফাত, রোগা-পাতলা, চোখে চশমা। ওকে আমার ঠিক আমার বয়সী লাগে না। কথাবার্তা খুব গম্ভীর প্রকৃতির, তবে প্রচন্ড পড়ুয়া ছেলে। বলতে গেলে তাকে আমার কাছে ছোটখাটো সাইন্টিস্ট মনে হয়। ভুল বললাম, শুধু আমার না। আমরা সবাই ওকে সাইন্টিস্ট বলে ডাকি । সারাদিনই কোন না কোন এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে পড়ে থাকে। বাসার ছাদে একটা ছোট্ট ঘর আছে রাফাতের। সেখানে সে ছোটখাট একটা ল্যাবরেটরি তৈরি করেছে।দেখলে মনে হয় অনেক ব্যয়বহুল একটা গবেষণাগার। কিন্তু রাফাত কথা, "এটা সম্পূর্ণভাবে তৈরি করতে আরও কিছু কাজ করতে হবে। কী কাজ জানতে চাইলে "রাফাত ভ্রু কুচক্রে মাথা নাড়তে নাড়তে
-- "আছে দোস্ত, কাজ আছে, সময় হলেই জানবি।"
সে কোন সময়ের কথা বোঝাতে চায় আমরা তা বুঝতে পারি না। অবশ্য তা নিয়ে মাথাও ঘামাই না। রাফাতের সব কথাই ভারী রহস্যময়।

আমরা পাশাপাশি হাঁটছি।
"দোস্ত, তোর সাথে কিছু কথা ছিলো রে" জরুরী কণ্ঠে বলল রাফাত।

-- “বলিস কী রে! তুই দেখতে কেন পেঁচার মতো তার রহস্য তুই বের করে ফেলেছিস?"
ঠাট্টা করল আমি, জবাব দিল না রাফাত।
আমি সামনের দিকে হাঁটতে থাকলাম।
-- "রাফাত, এই রাফাত"
পাশে তাকাতেই দেখলাম রাফাত নেই, আশ্চর্য! রাফাতকে নিয়ে যতই হাসি-তামাশা করা হোক, সে কখনোই এভাবে উধাও হয়ে যায় না। যাই হোক, ব্যাপারটা সাধারন ভেবে আমলে নিলাম না।

বিকালে ব্যাডমিন্টন খেলতে গেলাম। সেখানেও রাফাতের দেখা পেলাম না। খেলায় এতোটাই মগ্ন হয়ে গেলাম যে, রাফাতের ব্যাপরটি কিছুক্ষনের জন্য ভুলেই গেলাম, খেলতে খেলতে ফ্লাওয়ারটা গিয়ে পড়লো মাস্টারের কুটিরের কাছে। মাস্টার হচ্ছে এই এলাকার ভদ্র একজন পাগল। সে সবসময় স্যুট-কোর্ট পরে থাকে। আমাদের খেলার মাঠের কাছে একটা ছোট কুটিরে থাকে। তাকে ঠিক অন্যান্য পাগলের মতো লাগে না। সে সারাক্ষণ ঘরে বসে ছোট একটা কী যেন লেখে আর বিড়বিড় করে কথা বলে। তাকে কেন মাস্টার ডাকা হয় তার কারণ সম্পর্কে কারোরই পরিষ্কার ধারণা নেই। এলাকার মুরুব্বিদের কেউ কেউ বলেন, সে এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলো। আবার অনেকে বলেন, সে আমেরিকাতে পিএইচডি করতে গেলে কোন এক অজানা কারনে বড় রকমের মানসিক আঘাত পায় । তারপর দেশে এসে পাগল হয়ে যায়। যাই হোক যে সে পাগল হবার আগে উচ্চ শিক্ষিত ছিল সেটা নিশ্চত বোঝা যায়।

মাস্টারের কুটিরের কাছে কেউ গেলেই সে ভয়ঙ্কর রেগে যায় এবং বলে,
-- "চুরি করবি? যা, ভাগ ভাগ?
কিন্তু আজ সেরকম কিছু হলো না। ফ্লাওয়ার
নিয়ে চলে এলাম। আমি আসার সময়ে মাঠে বন্ধুদের কাউকে দেখতে পেলাম না। বন্ধুদের খুঁজতে এদিক- ওদিক তাকাতেই হঠাত আমার মাথায় একটা আঘাত অনুভব করলাম। তারপর আর কোন কিছু মনে নেই।জ্ঞান ফিরতেই দেখি, আমি আমার ঘরে শুয়ে আছি। মাথা ঘুরানোর চেষ্টা করতেই দেখি চেয়ারে বসা রাফাত। আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে ।

"আমি এখানে কীভাবে? আমি তো খেলছিলাম" বললাম আমি।
"হ্যা, খেলছিলি....... -” মাকে আসতে দেখে সে থেমে গেল।

-- "লিখন, উঠলি, একটু সাবধানে থাকবি না, আর এভাবে মারল! আচ্ছা, নে নাশতা কর। রাফাত তুমিও খাও" মা টেবিলে খাবারের ট্রে রেখে চলে গেলেন।
-- আচ্ছা, রাফাত বল তো আমাকে আঘাত করলো কে?"
-- মাস্টার
-- মাস্টার? রাফাতের কথায় ভয়ানকভাবে চমকে গেলাম আমি। মাস্টার কখনো কারও ক্ষতি করে?
আর সবাই তখন তোরা কোথায় চলে গেছিলি? তুই-ই বা সকালে অমন করে...কথা শেষ করতে পারলাম না আমি,
-- "জানি, আমি সব জানি"
আমাকে থামিয়ে বলতে শুরু করল রাফাত।
-- সকালে তোকে এই সম্পর্কে বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুই পাত্তা দিলি না। যাই হোক, এখন বলি, --চারপাশে অদ্ভুত কিছু একটা ঘটছে আমাদের । কেউ সেটা টের না পেলেও আমি খুব ভালো করে বুঝতে পারছি। তবে বিষয়টি ভালো ভাবে নিশ্চিত হতে মাস্টারের কুটিরে যেতে হবে। আমার সাথে তুইও যাবি"।

আমি আর প্রশ্ন করলাম না। রাফাতের উপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে।

কীভাবে? মাস্টার সেখানে আমাদের ঢুকতে দিবে? তবুও কথা চালিয়ে যাওয়ার খাতিরে তাকে বললাম।

--"মাস্টার মারা গেছে এবং কবরও দেয়া হয়েছে।
-- কী বলিস? কীভাবে?”
আমি যেনো আকাশ থেকে পড়লাম।
-"সেটা আর জিজ্ঞেস করিস না " রাফাত হতাশভাবে মাথা নেড়ে বলল।
-- আর সবাই তখন কোথায় চলে গেছিল? তুই-ই বা সকালে অমন করে--(কথা শেষ করতে পারলাম না আমি) মাস্টার পাগল হলেও তার মৃত্যুর কথা শুনে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি তাকে।

মাস্টারের কুটিরে এসে পৌঁছালাম আমরা, দরজায় তালা টালা কিছু নেই। ভিতরে ঢুকে ভয়ানক রকম চমকে গেলাম আমরা । ভেতরে কেবল বই আর বই! এখানে সেখানে ছড়ানো ছিটানো ঘর ভর্তি বই। যেগুলো সবই বিজ্ঞানের বই। এই পাগলা লোক বিজ্ঞানের বই দিয়ে কী করতো? আমার মাথায় ঢুকছে না। রাফাত মাস্টারের নোটবুকটা হাতে নিল। আমিও রাফাতের কাছে গিয়ে দেখতে লাগলাম। রাফাত নোটবইটা খুলে গভীর ভাবে পড়তে লাগলো।  তখন ধীরে ধীরে আমাদের কাছে সবকিছু পরিষ্কার হতে শুরু করল। এই বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির রহস্যের ইতিহাস আমরা জানতে শুরু করলাম।
রাফাত কেমন যেনো করতে শুরু করলো-
তবে কি মাস্টারই খুলে দিয়েছে নতুন এক আবিস্কারের পথ?  বিজ্ঞানের নতুন এক দিগন্ত?
"মানুষ এখন আর মৃত্যুকে বরণ করবে না। অমর হয়ে বাঁচবে পৃথিবীর বুকে" নোট থেকে মুখ ফিরিয়ে মাস্টারের মত বিড়বিড় করে বলল রাফাত। 

লিখেছেনঃ
মাহজাবিন হাসান রায়া, 
৫ম শ্রেণি 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যুদ্ধ নয় শান্তি চাই, শিশুর বাসযোগ্য পৃথিবী চাই

বৃত্তি পরীক্ষা ও শিশুর অধিকার: বৈষম্যের বিপরীতে যুক্তির ভাষা

বাংলা ছড়া : তানজিলা কাওছার