রেজামারার লোমহর্ষক সত্য ঘটনা



সালটা ১৯৭১। বাংলাদেশ অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব
পাকিস্তানে তখন পুরোদমে যুদ্ধ চলছে, মুক্তিযুদ্ধ। যে যুদ্ধে প্রাণ ঝড়িয়েছেন ত্রিশ লাখ মানুষ, সম্ভ্রম হারিয়েছেন লক্ষাধিক মা-বোন। হ্যাঁ, আমি বাংলাদেশের সেই স্বাধীনতা সংগ্রামের কথাই বলছি। গল্পটা তাহলে শুরু থেকেই বলি, বাঙালি জাতি সাক্ষী হচ্ছে এক রক্তক্ষয়ী মহাপ্রলয়ের। দেশের প্রতিটি জায়গায় তখন মুক্তিবাহিনীর বিস্তৃতি। পাক হানাদারদের ক্ষমতা নিশ্চিহ্ন হয়েছে, অনিশ্চিত হয়েছে তাদের জীবন। একই অবস্থা তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকারদেরও। একবার মুক্তিবাহিনীর হাতে পড়লে আর রক্ষা নেই। মৃত্যু নিশ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেই। মুক্তিযুদ্ধের একদম শেষ পর্যায়ে দেশ স্বাধীনের দু-তিন দিন আগে পুরো দেশে প্রচুর পরিমাণে দেশদ্রোহী রাজাকারদের হত্যা করা হয়েছে। সম্ভবত, জয় নিশ্চিত জেনেই বাঙালিরা বুকে বল সঞ্চয় করে অস্ত্র হাতে কঠোরভাবে দমন করতে পেরেছিল এই পাষণ্ড দেশদ্রোহীদের।

নরসিংদী জেলার অন্তর্গত বেলাব উপজেলা। বেলাব উপজেলার অনেক জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের বেশ কিছু ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন এখনও বিদ্যমান। এসকল ধ্বংসাবশেষ নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, মুক্তিযুদ্ধ ঠিক কতটা ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক ছিল। এমনই একটি গল্প রয়েছে। গল্প বললে আসলে ভুল হবে। কেননা, এসবই তো বাস্তব ঘটনা আর অনেকের নিজ চোখে দেখা।

দেশ-স্বাধীন হওয়ার দু'একদিন আগের কথা। বেলাব উপজেলার নারায়নপুর ইউনিয়নের গ্রাম মরিচাকান্দা। এই মরিচাকান্দা গ্রামেই সম্ভ্রান্ত খান পরিবারের বসবাস। আশেপাশের দশগ্রামে বাড়িটি 'খানবাড়ি' বা অনেকের কাছে 'হাজীবাড়ি' হিসেবেও পরিচিত। এই খানবাড়ির কর্তৃ জুমাদি বিবি, আব্দুর রশীদ খানের সহধর্মিণী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একটি নিঃস্বার্থ নিবেদিত প্রাণ। খানবাড়িটি একদম সড়কের লাগোয়া হওয়ায় এবং বাড়ির পাশে প্রবাহিত আড়িয়ালখাঁ নদীর শাখা কাঁকন নদীর মাধ্যমে নদীপথে যাতায়াত সুবিধাজনক হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়শই এখানে আশ্রয় নিতেন। খানবাড়িতে ঢুকতে পূর্বদিকে অতিথিদের জন্য ছিল একটি বিশেষ বাংলো ঘর। কখনো কখনো ২৫-৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাও এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। বাড়ির কর্তৃ জুমাদি বিবি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাত জেগে রান্না করতেন ও নিজ হাতে যত্ন সহকারে খাওয়াতেন। যোদ্ধাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদিও যোগাড় করা হতো খানবাড়ি থেকে। বিশেষ কোনো অপারেশনের পূর্বে আমাদের বাড়ি থেকে টর্চ লাইট, শুকনা খাবার ইত্যাদি দিয়েও সাহয্য করা হতো।

এমনি করে দেখতে দেখতে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তের কাছে এসে খানবাড়ি সাক্ষী হয় এক লোমহর্ষক ঘটনার। আমাদের বাড়ির উত্তরদিকে কাঁকন নদীর পাড়ে তালগাছবেষ্টিত একটি জায়গা ছিল ঢিলার মত, মাটি থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে যার চার ধারেই উঁচু উঁচু কতগুলো তালগাছ ছিল। দেশ স্বাধীনের আগের দিন মুক্তিযোদ্ধারা খবর পেলেন যে, নদীর ওপাড়ের কালিকাপ্রাসাদ থেকে নৌকাযোগে সাত-আটজন রাজাকার এইদিকে আসবে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা নির্ধারিত সেই স্কুলে উপস্থিত হয়ে আটজন
রাজাকারকে আটক করেন। অতঃপর, লাঠি, কোদাল
ইত্যাদি অস্ত্রের সাহায্যে রাজাকারদের মৃত্যু নিশ্চিত করেন। (যদিও অনেকে মনে করেন যে পিটুনির পরও দুতিনজন অধমরা অবস্থায় ছিল)। রাজাকারদের মারা হয়েছিল সেই তালগাছঘেরা টিলাটির উপর। টিলাটির উপর দিয়ে একটি ড্রেন ছিল। যোদ্ধারা আগে থেকে খোড়া সেই ড্রেনটিকে আরও খানিকটা খুঁড়ে সেখানে রাজাকারদের আধমরা দেহগুলো কোনোরকম মাটি চাপা দেন। স্বাধীনতার কিছু দিন পর বাড়ির বউয়েরা নদীতে পানি আনতে গেলে
দেখতে পাওয়া যায় এক চরম বীভৎস অবস্থা। রাজাকারদের হাঁড়গুলো সব মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শেয়াল-কুকুরেরা হাঁড়গুলো কামড়াকামড়ি করছে। এরূপ ভয়ানক অবস্থা দেখে তারা বাড়ি ফিরে আসেন। ঐ ঘটনার পর থেকে মানুষের মুখে মুখে জায়গাটির নাম হয় 'রেজামারা'। স্বাধীনতার পর থেকেই ঐ জায়গাটিতে বেশ কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে এবং এখনও ঘটছে যা মানুষকে অশরীরি কোনোকিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানান দেয়। প্রথমত, ঐ জায়গাটি জুড়ে এমন কয়েকটি রহস্যজনক চোরাবালির দেখা মিলে যা নিজে থেকে দৃশ্যমান হয় আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। গ্রামবাসীদের মধ্যে অনেকের গরু-ছাগল এই চোরাবালিতে পড়ে যায়। পরে লোকজন বহু চেষ্টা করে পশুগুলোকে উদ্ধার করতে; কিন্তু সেই চোরাবালি পশুগুলোকে নিজের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করে ফেলে। গ্রামবাসীগণ মনে করেন, এই চোরাবালির নিচে আছে কোনো গহীন সুড়ঙ্গপথ যেখানে ভুতুড়ে কিছু একটার অস্তিত্ব আছে এবং এসকল জীবের এই নির্মম পরিণতির পিছনে এরই হাত রয়েছে। যদিও এসব নিছকই মানুষের মুখের কথা মাত্র, নিতান্তই বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন। তবে পরের ঘটনাগুলো সত্যিই মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। চোরাবালির ঘটনাগুলোর পর থেকে মানুষ তেমনভাবে ঐদিকটায় যাতায়াত করে না বললেই চলে। এলাকাবাসীর ধারণা অনেকটা এরকম যে, সেই আটজন রাজাকারদের যেহেতু যথাযথ রীতি অনুসারে দাফন করা হয়নি তাই তাদের অতৃপ্ত আত্মা এখনও সেখানে বন্দি হয়ে আছে। প্রতিশোধের জন্য তারা এসকল কার্যকলাপ করছে। বেশ অনেকদিন কেটে গেছে তার পর। তেমন কোনো কিছু ঘটেনি। এর মধ্যে বেশ কয়েকবছর আগে বর্ষাকালের দিকে সেই একই জায়গায় হাঁটুপানিতে একব্যক্তির মৃতদেহ পাওয়া যায়। এলাকার লোকজন লাশ দেখে মৃতদেহ শনাক্ত করেন। চিকিৎসাশাস্ত্র মতে যদিও এটি হতে পারে যে লোকটির মৃত্যু স্ট্রোক করার কারণে হয়েছে; তবে একটি প্রশ্ন এখানে থেকেই যাবে। লোকটি স্ট্রোক করলে তার লাশ রেজামারার হাঁটুপানিতে যাবে কীভাবে! কিংবা লোকটি নিজের বাড়ি থেকে হঠাৎ সেখানেই বা যেতে গেলেন কেনো! এই প্রশ্নগুলোর আসলে কোনো উত্তর নেই, হয়তো চিরকাল অমীমাংসিতই থেকে যাবে প্রশ্নগুলো।

পরবর্তী ঘটনাটি ২০২১ সালের। এক মায়ের এক ছেলে বিজয়, চাকরি পাওয়ার খুশিতে আত্মহারা। পানিতে ভীষণ ভয় ছিল বিজয়ের। হঠাৎ কি মনে করে যেনো পানিতে গোসল করার ইচ্ছা হয়। চাকরিতে যাবার আগে তাই একদিন কাঁকন নদীতে নামল গোসল করার জন্য। সাথে সম্ভবত এলাকারই দুতিনজন ছেলে ছিল। একবার পানিতে ডুব দিয়ে বিজয় তো আর ওঠে না। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা বিজয়ের সন্ধানে পানির নিচে ডুব দেয়। খুঁজতে খুঁজতে পুরো নদী খোঁজা হয়ে গেল, কোথাও কিছু নেই। দুদিন ধরে পুরো গ্রাম খোঁজা হলো। ডুবুরি দিয়ে পুরো নদী দেখা হলো। কিন্তু, বিজয় কোথাও নেই। পুরো গ্রামের মানুষের চোখের পাতা এক হয় না। এমন রহস্যময় একটা ঘটনা। দু'দিন পর বিজয়ের লাশ পাওয়া যায় রেজামারার সেই টিলার ড্রেনটির পাশে। হাতে-পায়ে এমন কিছু আঘাতের চিহ্ন ছিল যার আদতে কোনো ব্যাখ্যাই ছিল না।

এই তো গেল বিজয়ের ঘটনা। এবার বলি এখানে ঘটে যাওয়া সর্বশেষ রহস্যময় ও অমীমাংসিত ঘটনা। আমার বড় আব্বু মোমেন খান। চাকরিজীবনে ছিলেন বিসিকের কর্মকর্তা। অবসর গ্রহণ করেন ২০১৮-২০০৯ সালের দিকে। বয়স আনুমানিক পঞ্চাশোর্ধ্ব। শুক্রবার দিন হঠাৎ কি মনে করে তার মাছ ধরতে যাবার ইচ্ছা হলো। বেলা এগারোটার দিকে একটি বড়শি, ছিপ, মাছের কিচ্ছু খাবার, পিড়ি ও একটি ছাতা নিয়ে রেজামারা নামক সেই অভিশপ্ত জায়গার উদ্দেশ্যে বের হন। বাড়িতে সবাই জানে তিনি মাছ ধরতে গেছেন; কিন্তু কোথায় গেছেন তা কাউকে বলে যাননি। যদিও বাড়ি থেকে তাকে আটকানো হয়েছিল জুমুআর নামাযের কথা বলে। কিন্তু, আমার বড়আব্বু মানুষটা এরকম ছিলেন যে তিনি একবার যা বলবেন তাই করবেন, তাতে যে যাই বলুক তিনি তা পরোয়া করেন না। বিকেলের দিকেও যখন তিনি বাড়ি ফিরছেন না তখন আমরা চিনায় পড়ে গেলাম। সন্ধ্যা হতে রাত পর্যন্ত খোঁজা হয় এলাকার সর্বত্র এবং নদীর পাড়েও। কিন্তু কিছু পাওয়া যায়নি; এমনকি বড়শি আর ছিটাও। নির্ঘুম রাত কাটে সকলের। কোনোরকমে ভোর হতেই আবার শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। ফলাফল শূণ্য। কেউ কেউ বলে যে বেলা বারোটার দিকে সিদ্দিকচর এলাকায় তারা একটি লাশ ভাসতে থাকে। খোঁজা হয় আবারও সর্বত্র। কিছু না পেয়ে আবারও সকলে বাড়ি ফিরে আসে। শেষ বিকেলে আবার যেন কী মনে করে সকলে খুঁজতে বেড়োয়। রেজামারার কাছাকাছি এসে খেয়াল করল যে নদীর ঠিক ওপাড় বরাবর কিছু একটা ভাসছে। নৌকা নিয়ে নদীর মাঝ খান থেকে উদ্ধার করা হয় বড় আব্বুর মৃতদেহ।

মৃতদেহটি দেখে বোঝা যায় যে তিনি সাঁতড়ে নদী পাড় হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু নদী পাড় হবার আগেই তো তার জান কবজ করার জন্য আজরাইল চলে আসছিল। বড় আব্বুর পায়ে জড়িয়ে গিয়েছিল কচুরিপানার ঝাঁক আর বিভিন্ন জলজ জংলা লতাপাতা। মৃতদেহ উদ্ধারের পর দেখা যায় যে বড়আব্বুর এক যতে তখনও সেই ব্যাগটি ছিল যেটি তিনি বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং অন্য হাতে মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় ছিল ঘাস। এই ঘাস থেকে আন্দাজ করা যায় যে মৃত্যুর আগে তিনি কতটা যন্ত্রণা অনুভব করেছিলেন এবং কী ভীষণভাবে ঘাসগুলো আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন। আশ্চর্য্যের বিষয় হলো এটিই যে, মৃত্যুর চব্বিশ ঘণ্টা পর যখন লাশ উদ্ধার করা হয় তখনও জিনিসগুলো বড়আব্বুর হাতে একইরকমভাবে আটকে ছিল এবং তা ছাড়াতেও বেশ বেগ পোহাতে হয়েছিল। এই সকল কিছু, এসকল ঘটনা আবারও প্রমাণ করতে চায় অশরীরীর অস্তিত্ব। গ্রামবাসীদের করা একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত অনেক বছর যাবৎ বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়েই জায়গাটিতে এই অদ্ভূত ও অমীমাংসিত মৃত্যুগুলো ঘটছে যার কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করানো আসলে অসম্ভব। তবে কী রেজামারার এই মৃত্যুখেলা কখনোই থামবে না!! অশরীরীর অভিশাপ থেকে কি কখনোই মুক্তি পাবে না রেজামারা? আর কত প্রাণ যাবে অঘোরে ?
(সমাপ্ত)

গল্পটি লিখেছেন:
ছোট্ট বন্ধু মেহজাবিন খান ইকরা
৬ষ্ঠ শ্রেণি

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যুদ্ধ নয় শান্তি চাই, শিশুর বাসযোগ্য পৃথিবী চাই

বৃত্তি পরীক্ষা ও শিশুর অধিকার: বৈষম্যের বিপরীতে যুক্তির ভাষা

বাংলা ছড়া : তানজিলা কাওছার