সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা সংস্কার: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা


বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা যে কারিকুলামের আলোকে পরিচালিত হচ্ছে, তার বড় কাঠামোগত সূচনা হয়েছিল ২০১২ সালের দিকে। সেই প্রক্রিয়ার মূল দায়িত্বে ছিল জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)। কিন্তু বাস্তবতা হলো—২০১২ আর ২০২৬ এক নয়। সময়ের ব্যবধানে ১৪ বছর, আর ২০০১ থেকে ২০২৬—এই ২৫ বছরের দীর্ঘ পরিসরে সমাজ, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ধরন আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—আমাদের শিক্ষা কাঠামো কি সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পেরেছে?

পরিবর্তিত বিশ্ব, পরিবর্তিত দক্ষতার চাহিদা

এক সময় শিক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল তথ্য আহরণ ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। কিন্তু এখন তথ্য হাতের মুঠোয়। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এসবের যুগে মুখস্থ বিদ্যার গুরুত্ব ক্রমশ কমছে।

বর্তমান বিশ্বে যেসব দক্ষতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি—

  • সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি (Critical Thinking)
  • সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা
  • যোগাযোগ দক্ষতা
  • সৃজনশীলতা
  • প্রযুক্তি ব্যবহার দক্ষতা
  • দলগত কাজের মানসিকতা

এই দক্ষতাগুলো পরীক্ষার খাতায় মুখস্থ লিখে প্রমাণ করা যায় না; এগুলো অর্জন করতে হয় প্রয়োগ ও অনুশীলনের মাধ্যমে।

নকল: উপসর্গ না মূল সমস্যা?

সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর নকলবিরোধী কঠোর অবস্থান জনমনে আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। পরীক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে আমাদের ভাবতে হবে—নকল কি মূল সমস্যা, নাকি এটি একটি উপসর্গ?

যখন মূল্যায়ন পদ্ধতি কেবল তথ্য পুনরুৎপাদনের উপর নির্ভরশীল হয়, তখন শিক্ষার্থী স্বাভাবিকভাবেই শর্টকাট খোঁজে। কিন্তু যদি প্রশ্ন এমন হয়—

  • বিশ্লেষণ করতে হবে,
  • মতামত যুক্তিসহ উপস্থাপন করতে হবে,
  • বাস্তব উদাহরণ দিতে হবে,
  • প্রকল্পভিত্তিক কাজ জমা দিতে হবে—

তাহলে নকল করার সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। বরং রেফারেন্স ব্যবহার, তথ্য অনুসন্ধান ও উদ্ধৃতি দেওয়া তখন শিক্ষারই অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

২০০১ বনাম ২০২৬: সময়ের ফারাক

২০০১ সালের পরীক্ষাকেন্দ্রিক কাঠামো দিয়ে ২০২৬ সালের ডিজিটাল বাস্তবতা মোকাবিলা করা কঠিন। আজকের শিক্ষার্থী কেবল বইয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়; সে অনলাইন কোর্স করে, ভিডিও দেখে শেখে, ভার্চুয়াল ল্যাব ব্যবহার করে, এমনকি এআই-এর সাহায্যে সমস্যা সমাধান করে।

এই প্রেক্ষাপটে পুরনো মূল্যায়ন পদ্ধতি অনেক সময় “পুরনো অ্যান্টিবায়োটিকের” মতো হয়ে যায়—যা একসময় কার্যকর ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আর আগের মতো ফল দেয় না।

কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নযোগ্য কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ—

১. মুখস্থনির্ভরতা হ্রাস:
প্রশ্নপত্র এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে যাতে বিশ্লেষণ ও প্রয়োগ দক্ষতা যাচাই হয়।

২. প্রকল্পভিত্তিক ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন:
শিক্ষার্থীর বছরব্যাপী অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৩. প্রযুক্তি সমন্বিত পাঠদান:
ডিজিটাল কনটেন্ট, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ও ভার্চুয়াল ল্যাব ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে হবে।

৪. শিক্ষক প্রশিক্ষণ আধুনিকীকরণ:
শিক্ষকই শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁদের প্রযুক্তি ও নতুন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত করা ছাড়া কোনো সংস্কার টেকসই হবে না।

৫. দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম:
শুধু জিপিএ নয়, বাস্তব দক্ষতা অর্জনই হতে হবে মূল লক্ষ্য।

শিক্ষা: পরীক্ষার জন্য নয়, জীবনের জন্য

পরীক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; এটি একটি মানদণ্ড তৈরি করে। কিন্তু শিক্ষা কেবল পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একজন শিক্ষার্থীকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে সে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে, সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল নাগরিক হতে পারে এবং নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

প্রত্যাশার জায়গা

নতুন নেতৃত্বের কাছে আমাদের প্রত্যাশা—
তিনি যেন কেবল শৃঙ্খলা জোরদার না করেন, বরং সময়োপযোগী ও বৈশ্বিক মানসম্পন্ন একটি শিক্ষা কাঠামো নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন।

সময় বদলেছে, বিশ্ব এগিয়েছে। এখন শিক্ষা ব্যবস্থাকেও এগোতে হবে সাহসী সিদ্ধান্ত, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবমুখী প্রয়োগের মাধ্যমে।

শিক্ষা যদি যুগোপযোগী হয়, তবে জাতিও হবে সক্ষম। আর সেই সক্ষমতার ভিত্তিই গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষ থেকে—যেখানে শিক্ষার্থী কেবল পাস করার জন্য নয়, জীবন গড়ার জন্য শিখে।


এম. মাহামুদুল হাসান
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাপ্রশাসক
ব্লগ: HawaiiMeeThai

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যুদ্ধ নয় শান্তি চাই, শিশুর বাসযোগ্য পৃথিবী চাই

বৃত্তি পরীক্ষা ও শিশুর অধিকার: বৈষম্যের বিপরীতে যুক্তির ভাষা

দল নয়, মানুষ: একটি দলনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন