নরসিংদী জেলার সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা ও সীমাবদ্ধতা
সাহিত্যের গতিপথ ত্রিভঙ্গিম, সত্য,সুন্দর ও শৈল্পিক। নন্দন মাঠে অনুভূতির ভাষাগত বপনই সাহিত্য।প্রকৃতার্থে সাহিত্য হলো জীবনাচারের ভাষাগত শৈল্পিক প্রকাশ। ভাষা সৃষ্টির কাল থেকেই মানুষ ভাষাগত অনুভূতি প্রকাশের উপায় খুঁজছে আর সময়ান্তরে তা হয়েছে বিচিত্রমাত্রিক।
মানুষের চিন্তাজগত বিচিত্র বলে এর ভাষাগত প্রকাশও বিচিত্র। হাসি-কান্না,সুখ-দু:খ এসব অনুভবের আক্ষরিক আঁচড়েই নান্দনিক হয় সাহিত্যের সোপান। কথা আর সাহিত্যের মধ্যে পার্থক্য হলো অলঙ্কার আর কাঠামো। যাকে আমরা সাহিত্য বলবো তার নর্ম অনুযায়ী ভাষাগত শরীর ও অলঙ্কার থাকা চাই। অনুভূতির জগত অনেকটা অদৃশ্যমান হলেও সাহিত্য দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান দুই ভঙ্গিমায় হাঁটাচলা করে।
প্রকৃতার্থে সাহিত্যের কোনো শিক্ষক বা গুরুজি নেই। কেউ কেউ বলে থাকেন,আছে,লাগে।আমার দৃষ্টিতে এসব লাগেনা।যদি তেমন ভাবে প্রয়োজন হতো তাহলে লালন,রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল সাহিত্য চর্চা করতে পারতেন না। কিছুটা ভাষাজ্ঞান থাকার পরে পরিবেশ,পরিস্হিতি,স্বগত ভাবনার সূক্ষ্ম অনুভূতি গুলো অনুরণন পেলে চেতনার চাতালে হেসে ওঠে সাহিত্যের ফল্গুধারা।
আবহমান কাল থেকে আমাদের নরসিংদীর নন্দন হলো তাঁতকাপড়,তরিতরকারি ও নানান ফলমূল।তাই মনন প্রকর্ষণে সাহিত্য সংস্রবের পরিবর্তে পল্লবিত হয়েছে কৃষি অর্থাৎ মাটির মহিমাকীর্তন। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষা, মেঘনা, হাঁড়িধোয়া, আড়িয়াল খাঁ, কাঁকন ও পাহাড়িয়া নদীর পেলব পলল মানুষকে যতটুকু আবেগী বা বিবাগী করেছে তারচেয়ে বেশি করেছে কৃষিমুখী ও শিল্পমুখী।তাই সাহিত্য এখানে পারিযায়ী অথবা পরিব্রাজক গোছের।অতীতে কেউ কেউ ছিলেন দ্বিজ।বসবাস করতেন শহরে অকস্মাৎ উঁকি দিতেন মফস্বলে।নরসিংদীর মাটি কামড়ে পড়ে থাকা, নরসিংদীর ধূলোবালি মাখা, সর্বাঙ্গে নরসিংদীর রঙ-রসদ মাখা স্হির স্হিতধী কবি-লেখক এখানে খুবই কম।শামসুর রাহমান,ড.আলাউদ্দিন আল আজাদ, ড.মনিরুজ্জামান, ড.সফিউদ্দিন আহমেদ, হরিপদ দত্ত, সোমেন চন্দ, সাবির আহমেদ চৌধুরী,দ্রাবির সৈকত,এম আর মাহবুব,মোহাম্মদ সা'দত আলী, মাসুদ পথিক, স্নিগ্ধা বাউল কেউ নরসিংদীতে বসবাস করতেন না বা করেন না।
এককালে নরসিংদী ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ। বিপ্লবী সতীশ চন্দ্র পাকড়াশী,সুন্দর আলী গান্ধি, ললিত মোহন রায়, সোমেন চন্দ, সুনীল বরণ রায়, সেকান্দর মাস্টার, বিজয় ভূষণ চ্যাটার্জি,জিতেন্দ্র কিশোর মৌলিক ও কামিনী কিশোর মৌলিকরা বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন সমিতির মাধ্যমে এলাকায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন বেগবান করেছিলেন। এসব আন্দোলনের অগ্নিছটা ও আভা-বিভায় বেশ রক্তরাঙা হয়েছে এই অঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতি।সেই চেতনার রঙ-রসদে প্রতিবাদী ও বিপ্লবী সাহিত্যের সাথে পরিচিত হয়েছে এই অঞ্চলের বোদ্ধা পাঠক।তাই এই অঞ্চলের সাহিত্যকর্মকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।যেমন বিপ্লবী চেতনার সাহিত্য,লোকসাহিত্য,মরমি বা ভাববাদী সাহিত্য,ধর্মসাহিত্য,আধুনিক ও উত্তরআধুনিক সাহিত্য।
সতীশ চন্দ্র পাকড়াশী, হরিচরণ আচার্য, সোমেন চন্দ, প্রিয়বালা গুপ্তা তাঁদের বোধভাবনায় ঘুরেফিরে এসেছে বিপ্লব,সংগ্রাম ও দ্রোহ। ঊনিশ শতকের ঊষালগ্নে কবি আজিজুল হাকিম,কবি বেনজীর আহমেদ,কবি অক্রূর চন্দ্র ধর ছিলেন সাহিত্যাকাশের ধ্রুবতারা। মরমিয়া মানবতাবাদ ও ভাববাদের নিগূঢ় তত্ত্বলোকে নিবিষ্ট ছিলেন কাঙালি বাউল,দ্বিজ দাস ও সাবির আহমেদ চৌধুরী।তাঁদের সংগীতও কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে সৃষ্টতত্ত্ব ও দেহতত্ত্বের গূঢ় গভীর বিশ্লেষণ। ঊনিশ শতকের ঊষালগ্নের কবি,নাট্যব্যক্তিত্ব ও ইতিহাসকার অধ্যাপক সুরেন্দ্র মোহন পঞ্চতীর্থ আমাদেরকে অনেক জ্ঞানগর্ভ সাহিত্যকর্ম উপহার দিয়েছেন।তাঁর লিখা 'মহেশ্বরদীর ইতিহাস' অতীতবীক্ষণের এক নতুন নেত্র।পরবর্তীতে নাট্যকার অক্রূর চন্দ্র ধর,অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন আহমেদ,সন্তোষ শীল,শ্রী হীরেন্দ্র কৃষ্ণ দাস,জালাল উদ্দিন,অনুপ ভৌমিক,শাহ আলম,ইউনুছ মিয়া,আবুল হোসেন পাঠান,মতিউর রহমান,মহিউদ্দিন ভূইয়া হীরা,মোছলেহ উদ্দিন বাচ্চু প্রমুখ নরসিংদী নাট্য আন্দোলনকে শুধু বেগবানই করেননি,সৃষ্টি করেছেন নাটকের নতুন ধারা।
ইতিহাসচর্চা, গবেষণা ও অতীতবীক্ষণে যাঁরা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন তাঁদের মধ্যে ত্রৈলোক্যনাথ ভট্টাচার্য,মুহাম্মদ ওসমান গণি, ড.মনিরুজ্জামান, ড.সফিউদ্দিন আহমেদ,সুরমা জাহিদ, সরকার আবুল কালাম, ইমাম উদ্দিন,সফিকুল আজগর ও সিরাজ উদ্দিন সাথীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে । ভাষা ও লোকসাহিত্য গবেষণায় ড.মনিরুজ্জামান, ধ্বনিতত্ত্ব ও বানান রীতিতে প্রফেসর কালাম মাহমুদ,মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় সুরমা জাহিদ, ভাষাআন্দোলন গবেষণায় এম আর মাহবুব আমাদেরকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
শাস্ত্রীয় সংগীত জগতকে যাঁরা ঝংকৃত করেছেন তাঁদের মধ্যে ইংরেজ আমলে রেনুকা সেন,রমা রায় আর পাক আমলে ওস্তাদ কালু মিয়া,মফিজুল ইসলাম,অধ্যাপক মো:আবদুত তাহের,হালে হরিমোহন দেবনাথ,মতিউর রহমান চৌধুরী,আবুল হোসেন খোকন ও আসাদুজ্জামানের নাম অতি উজ্জ্বল। ধর্মীয় ভাবধারার লেখকদের মধ্যে ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয়।তাছাড়া মীর রহমত আলী,মৌলভী মোজাফফর হুছাইন,মৌলভী আবু তাহের,মৌলভী আব্দুল খালেক ও হাশেম খানের নাম উল্লেখযোগ্য।
লোকসাহিত্যে কবিয়াল হরিচরণ আচার্য এক বিস্ময়কর প্রতিভা।নরসিংদীর লোকসাহিত্যের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন লোকসাহিত্য গবেষক মোহাম্মদ হানীফ পাঠান ও হাবিবুল্লা পাঠান।কাদাখোঁচা পাখির মতো তাঁরা মাটি খোঁড়ে খোঁড়ে বের করেছেন লোকসাহিত্যের মানিক,রতন।তাছাড়া কিসসাকার দেওয়ান হাফিজ ও আবদুল হাকিম কুঁইড়া,পুঁথিকার দারোগালি,ভাটকবি মফিজ উদ্দিন নরসিংদীর লোকসাহিত্যের প্রাণপুরুষ।
আধুনিক কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে কবি শামসুর রাহমান এক ধ্রুবতারা।তিনি উভয় বাংলায় সমান জনপ্রিয় ও খ্যাতিমান।তাঁকে নগরকবি,স্বাধীনতার কবি, মিথের কবি এমন অনেক অভিধাই দেওয়া যায়। বায়ান্নের ভাষাআন্দোলন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান অবধি প্রতিটি জাতীয় আন্দোলনে তাঁর কবিতা আমাদেরকে পথ দেখিয়েছে,যুগিয়েছে সাহস ও প্রেরণা। সাহিত্যের সব্যসাচী ড.আলাউদ্দিন আল আজাদ এক বিস্ময়কর প্রতিভা। সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় তাঁর ছিল সাবলীল সন্তরণ।কবিতা,নাটক,ছোটগল্প,উপন্যাস,প্রবন্ধ এমনকি শিশুসিহিত্যেও নজর দিতে ভুলেননি।হরিপদ দত্ত আধুনিক কথাসাহিত্যের এক অতি উজ্জ্বল নক্ষত্র।অনুবাদসাহিত্যে হুমায়ূন কবীর দিন দিন ছড়িয়ে দিচ্ছেন আপন ঔজ্জ্বল্য। তবে কবি শামসুর রাহমান ও কবি আলাউদ্দিন আল আজাদের পর নরসিংদীর সাহিত্যাকাশে তেমন দ্যুতিমান কবি লেখকের আবির্ভাব হয়নি,তবু যাঁরা বর্তমানে নরসিংদীর আধুনিক সাহিত্যকে মহিমান্বিত ও গৌরবান্বিত করে যাচ্ছেন তাঁদের মধ্যে কবি মাসুদ পথিক,কবি দ্রাবিড় সৈকত,স্নিগ্ধা বাউল,মহসিন খোন্দকার,সুমন ইউসুফ,হাসনাইন হীরা,রফিকুল নাজিম,মাহবুবুল আলম কনক,আখতার হোসেন ও শামিমা আক্তার শিমুর নাম অতি উজ্জ্বল। পাশাপাশি ছড়াসাহিত্যেও নরসিংদীতে বেশ কয়েকজন মেধাবী মুখ রয়েছে তাঁদের মধ্যে ছড়াকার আবু আসাদ(প্রয়াত),এমদাদুল ইসলাম খোকন,মহসিন খোন্দকার ও ফজলুল হক মিলন প্রমুখ অন্যতম।
নরসিংদী শিল্প কলকারখানার শহর। অনেকেই বলে থাকেন লোহালক্কড়ের সাথে কবিতা যায়না,সাহিত্য বেমানান।কথাটি পুরোপুরি অসত্য নয়। তবে মূল সমস্যা এখানে নয়,মূল সমস্যা হলো মানুষের অধিক মাত্রায় মুদ্রামোহগ্রস্ততা। মুদ্রাকেন্দ্রীক জীবনযাপন ও প্রাচুর্যে মহাসুখ অনুভব করা। পৃথিবীময় ধনতন্ত্রের উত্থান,মানুষের ভেতর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ মাথাচাড়া দেওয়া,আমিত্ববাদ বা অহংবাদের প্রবল চোরাটান,মানুষ থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন (এলিয়েনেশন) হওয়ার জট-জটিলতাই সাহিত্য সংহারের জন্যে যথেষ্ট।আমাদের মগজে ভোগবাদ যতো জেঁকে বসবে কাব্য-কলা ততোই নির্বাসিত হবে। আগে আমরা ভাতে গরীব ছিলাম-হৃদয়ে ছিলাম ঋদ্ধ,এখন আমরা ভাতে ঋদ্ধ কিন্তু হৃদয়ে কাঙাল। ইদানিং একটি বিশ্রী বাণী সমাজবাতাসে খুব ভেসে বেড়াচ্ছে-''কবিতায় ভাত জোটেনা।" তাছাড়া সমাজের অনেকে অনেক জায়গায় কবি-লেখককে হেয় করে মজা পান,বিকৃত সুখ অনুভব করেন,কবি-লেখক নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেন।অনেক সময় কবি-লেখকদেরকে আঁতেল,পাগল,তারছেঁড়া এসব বলতেও দ্বিধাবোধ করেন না। কবিতার সাথে ভাতের কী সম্পর্ক!কবিতা কখনোই ভাত দেয়নি,এখনো না আগেওনা।কিন্তু আগে কেউ কবিতার সাথে এমন বিশ্রী তুলনা দিতেননা কিন্তু এখন দেন।এর মূল কারণ আমাদের চিন্তাজগতের আমূল পরিবর্তন।সমাজ চায় প্রতিষ্ঠা,সমাজ চায় প্রাচুর্য,সমাজ চায় মুদ্রা।কবিতা কি স্টকএকচেঞ্জ?দৌলদিয়াঘাটের দালাল? উঠতি নেতার খুশি?স্বৈরশাসকের বুটের সুকতলা লেহনের জিভ? এসবের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্হান করে কবিতা।
কবি শামসুর রাহমান ও কবি আলাউদ্দিন আল আজাদের পর নরসিংদীর সাহিত্যাঙ্গন অনেকটা খা খা বিরানভূমি।প্রায় ত্রিশ লক্ষ জন অধ্যুষিত এই জনপদে কম-বেশি ৩০০ জন কবি লেখক আছেন।অর্থাৎ হাজারে একজন।সংখ্যা যা'ই হোক কোনো আপত্তি নেই কিন্তু এখানে কবি আছেন কিন্তু কবিতা নেই।সাহিত্যিক আছেন কিন্তু সাহিত্য নেই।জানি এই কথায় অনেকে বেশ কষ্ট পাবেন তবে অবস্হা ঠিক এমনই।হাতেগোনা কয়েকজনের কথা বাদ দিলে আর যাঁরা যার যার মতো লিখছেন-তাঁদের লেখার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।যাঁদের লেখা ঠিক সাহিত্য হয়ে উঠেনি এজন্যে তাদেরকে সরাসরি দোষ দেওয়া যায়না।সাহিত্যচর্চার জন্যে যে পরিবেশ পপরিস্হিতি দরকার,যে বলয় ব্যাপ্তি দরকার আমাদের নরসিংদীতে এসবের খুবই অভাব।ষাট সত্তরের দশকে পূর্বপাকিস্তানে সাহিত্যচর্চার বলয় কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল ঢাকার সদরঘাটের বিউটি বোর্ডিংকে কেন্দ্র করে।স্বাধীনতার পর আশির দশকে সেটি চলে আসে ঢাকার শাহাবাগে।বর্তমানে এটি আরো বিস্তৃতি লাভ করে বাংলাবাজার,কাঁটাবন ও পাঠকসমাবেশে স্হান নিয়েছে।নরসিংদীতে সাহিত্যচর্চার তেমন সুন্দর কোনো বলয় কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি।হালে নরসিংদীর খালপাড়ের বই-পুস্তক,ব্রহ্মপুত্র পত্রিকা,প্রগতি লেখক সংঘ,পরিশীলন সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ,নরসিংদী কবি সংসদ,নরসিংদী কবি-লেখক পরিষদ ও বেশ কিছু ফেইসবুক ভিত্তিক সাহিত্যচর্চা সংগঠন গড়ে ওঠেছে।
সাহিত্যচর্চার জন্যে দরকার স্হিরতা দৃঢ়তা ও ভাবগাম্ভীর্যতা।কিন্তু মানুষ ও সমাজ এখন তুমুল অস্হির। সবাই ছুটছে যার যার মতো।কারো জন্যে কারো অপেক্ষা করার ফুসরত নেই।মানুষ ছোট হতে হতে অতি ছোট হয়ে ঢুকে গেছে একান্ত নিজের ভেতর।সমাজভাবনা,রাষ্ট্রভাবনা,সাহিত্যচর্চা অনেকের কাছে সময়ের অপচয় মনে হয়,বেশতি কাজ মনে হয়।
অনেকেই বলে থাকেন লেখালেখির কোনো শিক্ষক নেই।আমার দৃষ্টিতে লেখালেখির শিক্ষক হলো সাথের লেখক,সাথের কবি ও বোদ্ধা পাঠক। কবির সাথে কবির আড্ডা না হলে,লেখকের সাথে লেখকের কথা না হলে,শিল্পীর সাথে শিল্পীর দেখা না হলে সাহিত্য শাণিত হয়না,পরিশীলিত হয়না।প্রকৃত লেখককে সাধারণ মানুষের ও তাদের যাপিত জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভ্রমণ পরিভ্রমণ করতে হয়।মানুষের জীবন গভীরে ডুব না দিয়ে জীবনঘনিষ্ট সাহিত্য সৃষ্টি করা অসম্ভব।পদ্মার পারে না গিয়ে শুধু বুদ্ধির নাড়াচাড়ায় মানিক বন্দোপধ্যায় "পদ্মা নদীর মাঝি' লিখেননি। এসব লিখতে গিয়ে নিশ্চয় তিনি পদ্মা পারের মানুষের যাপিত জীবনকে হৃদয়ে গভীর ভাবে ধারণ করেছিলেন।সত্যজিৎ রায় যে পথের প্যাঁচালি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন নিশ্চয় তিনি বিশতলার এসিক্ষকে বসে বানাননি। চলচ্চিত্রটির পরিবেশ পরিস্হিতি,আবেশ অনুভূতি নিশ্চয় হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন।
আজকাল অনেক কবি লেখকই বসবাস করেন শহরে সুরম্য অট্টালিকায়,প্রাচুর্যপূর্ণ জীবন যাপন করেন। তাঁরা কখনো শ্রমিকের ঘর্মাক্ত শরীর দেখেননা,কৃষকের চাষাবাদ দেখেননা,জেলেদের জীবন দেখেননা,রোদবৃষ্টি দেখেননা,নিবিড়ভাবে ভুখা নাঙ্গাদের জীবনসংগ্রাম না দেখেই তাঁদেরকে নিয়ে কাব্যের ফুলঝুরি ছড়ান,সাহিত্য বানান-এটা সম্পূর্ণ ভাওতাবাজি। এক্ষেত্রে তাঁরা যতো ভালো লিখুক না কেনো কোথাও না কোথাও ফাঁক থেকে যাবে।এভাবে যাঁরা এগুচ্ছেন আমার দৃষ্টিতে তারা কবিনা,কবি সাজেন,তারা লেখক না,লেখক সাজেন।তাঁরা অনেকটা পোশাকি,খোলসজাত,সাহিত্যের ভাড়াটে, হৃদয়ে সাহিত্য নেই,প্রাণে মানুষ নেই,সাহিত্যের নাম ভাঙ্গিয়ে চলেন। ঘন ঘন পদক নেন। যেনোতেনো ভাবে নিজের শরীরে কবি-লেখক তকমা লাগান,তারপর বনে যান তথাকথিত বুদ্ধিজীবী।এসবের কারণেও আমাদের প্রকৃত সাহিত্যসেবী মাঠে মারা যাচ্ছে।
লেখকঃ
মানুষের চিন্তাজগত বিচিত্র বলে এর ভাষাগত প্রকাশও বিচিত্র। হাসি-কান্না,সুখ-দু:খ এসব অনুভবের আক্ষরিক আঁচড়েই নান্দনিক হয় সাহিত্যের সোপান। কথা আর সাহিত্যের মধ্যে পার্থক্য হলো অলঙ্কার আর কাঠামো। যাকে আমরা সাহিত্য বলবো তার নর্ম অনুযায়ী ভাষাগত শরীর ও অলঙ্কার থাকা চাই। অনুভূতির জগত অনেকটা অদৃশ্যমান হলেও সাহিত্য দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান দুই ভঙ্গিমায় হাঁটাচলা করে।
প্রকৃতার্থে সাহিত্যের কোনো শিক্ষক বা গুরুজি নেই। কেউ কেউ বলে থাকেন,আছে,লাগে।আমার দৃষ্টিতে এসব লাগেনা।যদি তেমন ভাবে প্রয়োজন হতো তাহলে লালন,রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল সাহিত্য চর্চা করতে পারতেন না। কিছুটা ভাষাজ্ঞান থাকার পরে পরিবেশ,পরিস্হিতি,স্বগত ভাবনার সূক্ষ্ম অনুভূতি গুলো অনুরণন পেলে চেতনার চাতালে হেসে ওঠে সাহিত্যের ফল্গুধারা।
আবহমান কাল থেকে আমাদের নরসিংদীর নন্দন হলো তাঁতকাপড়,তরিতরকারি ও নানান ফলমূল।তাই মনন প্রকর্ষণে সাহিত্য সংস্রবের পরিবর্তে পল্লবিত হয়েছে কৃষি অর্থাৎ মাটির মহিমাকীর্তন। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষা, মেঘনা, হাঁড়িধোয়া, আড়িয়াল খাঁ, কাঁকন ও পাহাড়িয়া নদীর পেলব পলল মানুষকে যতটুকু আবেগী বা বিবাগী করেছে তারচেয়ে বেশি করেছে কৃষিমুখী ও শিল্পমুখী।তাই সাহিত্য এখানে পারিযায়ী অথবা পরিব্রাজক গোছের।অতীতে কেউ কেউ ছিলেন দ্বিজ।বসবাস করতেন শহরে অকস্মাৎ উঁকি দিতেন মফস্বলে।নরসিংদীর মাটি কামড়ে পড়ে থাকা, নরসিংদীর ধূলোবালি মাখা, সর্বাঙ্গে নরসিংদীর রঙ-রসদ মাখা স্হির স্হিতধী কবি-লেখক এখানে খুবই কম।শামসুর রাহমান,ড.আলাউদ্দিন আল আজাদ, ড.মনিরুজ্জামান, ড.সফিউদ্দিন আহমেদ, হরিপদ দত্ত, সোমেন চন্দ, সাবির আহমেদ চৌধুরী,দ্রাবির সৈকত,এম আর মাহবুব,মোহাম্মদ সা'দত আলী, মাসুদ পথিক, স্নিগ্ধা বাউল কেউ নরসিংদীতে বসবাস করতেন না বা করেন না।
এককালে নরসিংদী ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ। বিপ্লবী সতীশ চন্দ্র পাকড়াশী,সুন্দর আলী গান্ধি, ললিত মোহন রায়, সোমেন চন্দ, সুনীল বরণ রায়, সেকান্দর মাস্টার, বিজয় ভূষণ চ্যাটার্জি,জিতেন্দ্র কিশোর মৌলিক ও কামিনী কিশোর মৌলিকরা বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন সমিতির মাধ্যমে এলাকায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন বেগবান করেছিলেন। এসব আন্দোলনের অগ্নিছটা ও আভা-বিভায় বেশ রক্তরাঙা হয়েছে এই অঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতি।সেই চেতনার রঙ-রসদে প্রতিবাদী ও বিপ্লবী সাহিত্যের সাথে পরিচিত হয়েছে এই অঞ্চলের বোদ্ধা পাঠক।তাই এই অঞ্চলের সাহিত্যকর্মকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।যেমন বিপ্লবী চেতনার সাহিত্য,লোকসাহিত্য,মরমি বা ভাববাদী সাহিত্য,ধর্মসাহিত্য,আধুনিক ও উত্তরআধুনিক সাহিত্য।
সতীশ চন্দ্র পাকড়াশী, হরিচরণ আচার্য, সোমেন চন্দ, প্রিয়বালা গুপ্তা তাঁদের বোধভাবনায় ঘুরেফিরে এসেছে বিপ্লব,সংগ্রাম ও দ্রোহ। ঊনিশ শতকের ঊষালগ্নে কবি আজিজুল হাকিম,কবি বেনজীর আহমেদ,কবি অক্রূর চন্দ্র ধর ছিলেন সাহিত্যাকাশের ধ্রুবতারা। মরমিয়া মানবতাবাদ ও ভাববাদের নিগূঢ় তত্ত্বলোকে নিবিষ্ট ছিলেন কাঙালি বাউল,দ্বিজ দাস ও সাবির আহমেদ চৌধুরী।তাঁদের সংগীতও কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে সৃষ্টতত্ত্ব ও দেহতত্ত্বের গূঢ় গভীর বিশ্লেষণ। ঊনিশ শতকের ঊষালগ্নের কবি,নাট্যব্যক্তিত্ব ও ইতিহাসকার অধ্যাপক সুরেন্দ্র মোহন পঞ্চতীর্থ আমাদেরকে অনেক জ্ঞানগর্ভ সাহিত্যকর্ম উপহার দিয়েছেন।তাঁর লিখা 'মহেশ্বরদীর ইতিহাস' অতীতবীক্ষণের এক নতুন নেত্র।পরবর্তীতে নাট্যকার অক্রূর চন্দ্র ধর,অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন আহমেদ,সন্তোষ শীল,শ্রী হীরেন্দ্র কৃষ্ণ দাস,জালাল উদ্দিন,অনুপ ভৌমিক,শাহ আলম,ইউনুছ মিয়া,আবুল হোসেন পাঠান,মতিউর রহমান,মহিউদ্দিন ভূইয়া হীরা,মোছলেহ উদ্দিন বাচ্চু প্রমুখ নরসিংদী নাট্য আন্দোলনকে শুধু বেগবানই করেননি,সৃষ্টি করেছেন নাটকের নতুন ধারা।
ইতিহাসচর্চা, গবেষণা ও অতীতবীক্ষণে যাঁরা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন তাঁদের মধ্যে ত্রৈলোক্যনাথ ভট্টাচার্য,মুহাম্মদ ওসমান গণি, ড.মনিরুজ্জামান, ড.সফিউদ্দিন আহমেদ,সুরমা জাহিদ, সরকার আবুল কালাম, ইমাম উদ্দিন,সফিকুল আজগর ও সিরাজ উদ্দিন সাথীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে । ভাষা ও লোকসাহিত্য গবেষণায় ড.মনিরুজ্জামান, ধ্বনিতত্ত্ব ও বানান রীতিতে প্রফেসর কালাম মাহমুদ,মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় সুরমা জাহিদ, ভাষাআন্দোলন গবেষণায় এম আর মাহবুব আমাদেরকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
শাস্ত্রীয় সংগীত জগতকে যাঁরা ঝংকৃত করেছেন তাঁদের মধ্যে ইংরেজ আমলে রেনুকা সেন,রমা রায় আর পাক আমলে ওস্তাদ কালু মিয়া,মফিজুল ইসলাম,অধ্যাপক মো:আবদুত তাহের,হালে হরিমোহন দেবনাথ,মতিউর রহমান চৌধুরী,আবুল হোসেন খোকন ও আসাদুজ্জামানের নাম অতি উজ্জ্বল। ধর্মীয় ভাবধারার লেখকদের মধ্যে ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয়।তাছাড়া মীর রহমত আলী,মৌলভী মোজাফফর হুছাইন,মৌলভী আবু তাহের,মৌলভী আব্দুল খালেক ও হাশেম খানের নাম উল্লেখযোগ্য।
লোকসাহিত্যে কবিয়াল হরিচরণ আচার্য এক বিস্ময়কর প্রতিভা।নরসিংদীর লোকসাহিত্যের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন লোকসাহিত্য গবেষক মোহাম্মদ হানীফ পাঠান ও হাবিবুল্লা পাঠান।কাদাখোঁচা পাখির মতো তাঁরা মাটি খোঁড়ে খোঁড়ে বের করেছেন লোকসাহিত্যের মানিক,রতন।তাছাড়া কিসসাকার দেওয়ান হাফিজ ও আবদুল হাকিম কুঁইড়া,পুঁথিকার দারোগালি,ভাটকবি মফিজ উদ্দিন নরসিংদীর লোকসাহিত্যের প্রাণপুরুষ।
আধুনিক কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে কবি শামসুর রাহমান এক ধ্রুবতারা।তিনি উভয় বাংলায় সমান জনপ্রিয় ও খ্যাতিমান।তাঁকে নগরকবি,স্বাধীনতার কবি, মিথের কবি এমন অনেক অভিধাই দেওয়া যায়। বায়ান্নের ভাষাআন্দোলন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান অবধি প্রতিটি জাতীয় আন্দোলনে তাঁর কবিতা আমাদেরকে পথ দেখিয়েছে,যুগিয়েছে সাহস ও প্রেরণা। সাহিত্যের সব্যসাচী ড.আলাউদ্দিন আল আজাদ এক বিস্ময়কর প্রতিভা। সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় তাঁর ছিল সাবলীল সন্তরণ।কবিতা,নাটক,ছোটগল্প,উপন্যাস,প্রবন্ধ এমনকি শিশুসিহিত্যেও নজর দিতে ভুলেননি।হরিপদ দত্ত আধুনিক কথাসাহিত্যের এক অতি উজ্জ্বল নক্ষত্র।অনুবাদসাহিত্যে হুমায়ূন কবীর দিন দিন ছড়িয়ে দিচ্ছেন আপন ঔজ্জ্বল্য। তবে কবি শামসুর রাহমান ও কবি আলাউদ্দিন আল আজাদের পর নরসিংদীর সাহিত্যাকাশে তেমন দ্যুতিমান কবি লেখকের আবির্ভাব হয়নি,তবু যাঁরা বর্তমানে নরসিংদীর আধুনিক সাহিত্যকে মহিমান্বিত ও গৌরবান্বিত করে যাচ্ছেন তাঁদের মধ্যে কবি মাসুদ পথিক,কবি দ্রাবিড় সৈকত,স্নিগ্ধা বাউল,মহসিন খোন্দকার,সুমন ইউসুফ,হাসনাইন হীরা,রফিকুল নাজিম,মাহবুবুল আলম কনক,আখতার হোসেন ও শামিমা আক্তার শিমুর নাম অতি উজ্জ্বল। পাশাপাশি ছড়াসাহিত্যেও নরসিংদীতে বেশ কয়েকজন মেধাবী মুখ রয়েছে তাঁদের মধ্যে ছড়াকার আবু আসাদ(প্রয়াত),এমদাদুল ইসলাম খোকন,মহসিন খোন্দকার ও ফজলুল হক মিলন প্রমুখ অন্যতম।
নরসিংদী শিল্প কলকারখানার শহর। অনেকেই বলে থাকেন লোহালক্কড়ের সাথে কবিতা যায়না,সাহিত্য বেমানান।কথাটি পুরোপুরি অসত্য নয়। তবে মূল সমস্যা এখানে নয়,মূল সমস্যা হলো মানুষের অধিক মাত্রায় মুদ্রামোহগ্রস্ততা। মুদ্রাকেন্দ্রীক জীবনযাপন ও প্রাচুর্যে মহাসুখ অনুভব করা। পৃথিবীময় ধনতন্ত্রের উত্থান,মানুষের ভেতর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ মাথাচাড়া দেওয়া,আমিত্ববাদ বা অহংবাদের প্রবল চোরাটান,মানুষ থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন (এলিয়েনেশন) হওয়ার জট-জটিলতাই সাহিত্য সংহারের জন্যে যথেষ্ট।আমাদের মগজে ভোগবাদ যতো জেঁকে বসবে কাব্য-কলা ততোই নির্বাসিত হবে। আগে আমরা ভাতে গরীব ছিলাম-হৃদয়ে ছিলাম ঋদ্ধ,এখন আমরা ভাতে ঋদ্ধ কিন্তু হৃদয়ে কাঙাল। ইদানিং একটি বিশ্রী বাণী সমাজবাতাসে খুব ভেসে বেড়াচ্ছে-''কবিতায় ভাত জোটেনা।" তাছাড়া সমাজের অনেকে অনেক জায়গায় কবি-লেখককে হেয় করে মজা পান,বিকৃত সুখ অনুভব করেন,কবি-লেখক নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেন।অনেক সময় কবি-লেখকদেরকে আঁতেল,পাগল,তারছেঁড়া এসব বলতেও দ্বিধাবোধ করেন না। কবিতার সাথে ভাতের কী সম্পর্ক!কবিতা কখনোই ভাত দেয়নি,এখনো না আগেওনা।কিন্তু আগে কেউ কবিতার সাথে এমন বিশ্রী তুলনা দিতেননা কিন্তু এখন দেন।এর মূল কারণ আমাদের চিন্তাজগতের আমূল পরিবর্তন।সমাজ চায় প্রতিষ্ঠা,সমাজ চায় প্রাচুর্য,সমাজ চায় মুদ্রা।কবিতা কি স্টকএকচেঞ্জ?দৌলদিয়াঘাটের দালাল? উঠতি নেতার খুশি?স্বৈরশাসকের বুটের সুকতলা লেহনের জিভ? এসবের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্হান করে কবিতা।
কবি শামসুর রাহমান ও কবি আলাউদ্দিন আল আজাদের পর নরসিংদীর সাহিত্যাঙ্গন অনেকটা খা খা বিরানভূমি।প্রায় ত্রিশ লক্ষ জন অধ্যুষিত এই জনপদে কম-বেশি ৩০০ জন কবি লেখক আছেন।অর্থাৎ হাজারে একজন।সংখ্যা যা'ই হোক কোনো আপত্তি নেই কিন্তু এখানে কবি আছেন কিন্তু কবিতা নেই।সাহিত্যিক আছেন কিন্তু সাহিত্য নেই।জানি এই কথায় অনেকে বেশ কষ্ট পাবেন তবে অবস্হা ঠিক এমনই।হাতেগোনা কয়েকজনের কথা বাদ দিলে আর যাঁরা যার যার মতো লিখছেন-তাঁদের লেখার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।যাঁদের লেখা ঠিক সাহিত্য হয়ে উঠেনি এজন্যে তাদেরকে সরাসরি দোষ দেওয়া যায়না।সাহিত্যচর্চার জন্যে যে পরিবেশ পপরিস্হিতি দরকার,যে বলয় ব্যাপ্তি দরকার আমাদের নরসিংদীতে এসবের খুবই অভাব।ষাট সত্তরের দশকে পূর্বপাকিস্তানে সাহিত্যচর্চার বলয় কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল ঢাকার সদরঘাটের বিউটি বোর্ডিংকে কেন্দ্র করে।স্বাধীনতার পর আশির দশকে সেটি চলে আসে ঢাকার শাহাবাগে।বর্তমানে এটি আরো বিস্তৃতি লাভ করে বাংলাবাজার,কাঁটাবন ও পাঠকসমাবেশে স্হান নিয়েছে।নরসিংদীতে সাহিত্যচর্চার তেমন সুন্দর কোনো বলয় কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি।হালে নরসিংদীর খালপাড়ের বই-পুস্তক,ব্রহ্মপুত্র পত্রিকা,প্রগতি লেখক সংঘ,পরিশীলন সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ,নরসিংদী কবি সংসদ,নরসিংদী কবি-লেখক পরিষদ ও বেশ কিছু ফেইসবুক ভিত্তিক সাহিত্যচর্চা সংগঠন গড়ে ওঠেছে।
সাহিত্যচর্চার জন্যে দরকার স্হিরতা দৃঢ়তা ও ভাবগাম্ভীর্যতা।কিন্তু মানুষ ও সমাজ এখন তুমুল অস্হির। সবাই ছুটছে যার যার মতো।কারো জন্যে কারো অপেক্ষা করার ফুসরত নেই।মানুষ ছোট হতে হতে অতি ছোট হয়ে ঢুকে গেছে একান্ত নিজের ভেতর।সমাজভাবনা,রাষ্ট্রভাবনা,সাহিত্যচর্চা অনেকের কাছে সময়ের অপচয় মনে হয়,বেশতি কাজ মনে হয়।
অনেকেই বলে থাকেন লেখালেখির কোনো শিক্ষক নেই।আমার দৃষ্টিতে লেখালেখির শিক্ষক হলো সাথের লেখক,সাথের কবি ও বোদ্ধা পাঠক। কবির সাথে কবির আড্ডা না হলে,লেখকের সাথে লেখকের কথা না হলে,শিল্পীর সাথে শিল্পীর দেখা না হলে সাহিত্য শাণিত হয়না,পরিশীলিত হয়না।প্রকৃত লেখককে সাধারণ মানুষের ও তাদের যাপিত জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভ্রমণ পরিভ্রমণ করতে হয়।মানুষের জীবন গভীরে ডুব না দিয়ে জীবনঘনিষ্ট সাহিত্য সৃষ্টি করা অসম্ভব।পদ্মার পারে না গিয়ে শুধু বুদ্ধির নাড়াচাড়ায় মানিক বন্দোপধ্যায় "পদ্মা নদীর মাঝি' লিখেননি। এসব লিখতে গিয়ে নিশ্চয় তিনি পদ্মা পারের মানুষের যাপিত জীবনকে হৃদয়ে গভীর ভাবে ধারণ করেছিলেন।সত্যজিৎ রায় যে পথের প্যাঁচালি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন নিশ্চয় তিনি বিশতলার এসিক্ষকে বসে বানাননি। চলচ্চিত্রটির পরিবেশ পরিস্হিতি,আবেশ অনুভূতি নিশ্চয় হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন।
আজকাল অনেক কবি লেখকই বসবাস করেন শহরে সুরম্য অট্টালিকায়,প্রাচুর্যপূর্ণ জীবন যাপন করেন। তাঁরা কখনো শ্রমিকের ঘর্মাক্ত শরীর দেখেননা,কৃষকের চাষাবাদ দেখেননা,জেলেদের জীবন দেখেননা,রোদবৃষ্টি দেখেননা,নিবিড়ভাবে ভুখা নাঙ্গাদের জীবনসংগ্রাম না দেখেই তাঁদেরকে নিয়ে কাব্যের ফুলঝুরি ছড়ান,সাহিত্য বানান-এটা সম্পূর্ণ ভাওতাবাজি। এক্ষেত্রে তাঁরা যতো ভালো লিখুক না কেনো কোথাও না কোথাও ফাঁক থেকে যাবে।এভাবে যাঁরা এগুচ্ছেন আমার দৃষ্টিতে তারা কবিনা,কবি সাজেন,তারা লেখক না,লেখক সাজেন।তাঁরা অনেকটা পোশাকি,খোলসজাত,সাহিত্যের ভাড়াটে, হৃদয়ে সাহিত্য নেই,প্রাণে মানুষ নেই,সাহিত্যের নাম ভাঙ্গিয়ে চলেন। ঘন ঘন পদক নেন। যেনোতেনো ভাবে নিজের শরীরে কবি-লেখক তকমা লাগান,তারপর বনে যান তথাকথিত বুদ্ধিজীবী।এসবের কারণেও আমাদের প্রকৃত সাহিত্যসেবী মাঠে মারা যাচ্ছে।
লেখকঃ
মহসিন খোন্দকার
কবি ও ছড়াকার,
ইংরেজি সাহিত্যের সহকারী অধ্যাপক।
কবি ও ছড়াকার,
ইংরেজি সাহিত্যের সহকারী অধ্যাপক।
সুন্দর লেখা
উত্তরমুছুনভালো আলোচনা।
উত্তরমুছুনজ্ঞানগর্ভ , চমৎকার একটা লেখা
উত্তরমুছুনখুবই চমৎকার লিখেছেন, ধন্যবাদ।
উত্তরমুছুন