দরজা খুলে দেখি; কড়া নাড়ে স্মৃতি
নভেম্বর মানে খুব ব্যস্ত মাস মনে হতো। ডিসেম্বরের শুরুতে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা হতো। গ্রামের কাঁচা রাস্তায় কচি দুর্বাদলের আগায় নরম শিশির মাড়িয়ে পথ চলাটা প্রত্যেক গ্রামবাসীর জন্যই প্রতিদিনের একটি সাধারন ঘটনা। প্রাইমারীতে বাড়ির আঙিনার স্কুলে পড়লেও মাধ্যমিকে বেশ খানিকটা দূরে যেতাম। সকালে গরম ভাত, আলুভর্তা, ডাল খেয়ে যাওয়াটা অনেকখানি গৌরবের মনে হতো। তৈয়বআলী জামাই প্রতিদিন বাজারে গিয়ে মন্টুর দোকানে আটার রুটি আর আলুভাজি খেতো। আমরা হাসাহাসি করতাম। আমাদের কাছে মনে হতো বাড়িতে ভাত না থাকলে বুঝি মানুষ বাজারে গিয়ে রুটি খায়। আমাদের স্কুলের দুই পাশে দুটো গার্লস স্কুল ছিলো। স্কুলে যাওয়া আসার সময়ে গার্লসের রাস্তা দিয়ে যাওয়া অনেক বন্ধুদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিলো । আমিও মাঝে মধ্যে যেতাম, তবে কেনো যেতাম সেটা তখন না বুঝলেও এখন বেশ বুঝি। সুফিয়ান স্যারের কাছে ইংরেজি আর গনিত বিষয়ে প্রাইভেট পড়তাম। স্যারের একটা ট্রেন্ড ছিলো স্যার ভালো স্টুডেন্ট ছাড়া পড়াতেন না। স্যার প্রায়ই একটা গল্প বলতেন, একবার কোন এক বন্ধুর বাড়িতে স্যার বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখেন একটা ক্যালকুলেটর পড়ে রয়েছে। স্যার সেটা নেননি, এমনকি ছুয়েও দেখেন নি। স্যারে গল্পটি খুব সাধারন হলেও আমার মনে এখনও দাগ কেটে রয়েছে। এখানে শ্রদ্ধেয় স্যার সম্পর্কে কিছু বুঝাতে চাইনি। বরং আমি যেটা বুঝাতে চেয়েছি সেটা হচ্ছে ক্যালকুলেটর। আমি ৫ম শ্রেণিতে সেন্টার পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করাতে আমাকে আমার বাবা আমাকে একটা ক্যালকুলেটর উপহার দিয়েছিলেন। ক্যালকুলেটরটি পেন্সিল ব্যাটারীতে চলতো। তখন শিক্ষার্থীরা ক্যালকুলেটর তেমন ব্যবহার করতো না। দশম শ্রেণি অব্দি আমি সেটা ব্যবহার করেছিলাম।
ক্লাসে সেভেনে আমার একটা বন্ধু ছিলো। সে প্রায়ই আমার নিকট থেকে ক্যালকুলেটরটা ধার নিয়ে জামার পকেটে করে রাস্তায় যেতো। একদিন আমি পিছু নিয়ে দেখি, ওটা কানে দিয়ে কার সাথে যেনো কথা বলছে। মুলত : সে বছর এপ্রিল মাসেই বাংলাদেশে প্রথম মোবাইল ফোন চালু হয় । হাচিসন বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (এইচবিটিএল) ঢাকা শহরে AMPS মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইল ফোন সেবা শুরু করে। কিন্তু সেটা আমার ওই বন্ধুর জানার কথা নয়। এখন বুঝতে পেরেছি বন্ধুটা হয়তো ট্রালেন্ট ছিলো। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে কিছু একটা করে ফেলতো। পরে জানতে পেরেছিলাম বন্ধুটি তার বান্ধবীকে দেখিয়ে এ কাজ করতো। অবশ্য বন্ধুটির বান্ধবীর তালিকা প্রতি বছরই পাল্টে যেতো। জীবনে কখোনো তার কোনো বান্ধবীর সাথে কথা বলেছে কিনা সেটা কেউ কখোনো বলতে পারেনি।
প্রায় ১৪ বছরেও বেশি সময়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়াই। আমাদের সময়ে আমরা যতটা দুস্টু ছিলাম আমার কাছে কেনো যেনো মনে হয় ইদানিংকার ছেলেমেয়েরা আমাদের চেয়ে কম দুস্টুমি করে। নাকি ওদের দুস্টুমির ধরনটা পরিবর্তন হয়ে গেছে যা আমরা বুঝতে পারিনা। আমাদের সময়ে রাস্তায় কোন মেয়ের সাথে কথা বলাটা রীতিমত দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গন্য হতো। খুব জানতে ইচ্ছে করছে, সেই দন্ডটা এখন কোন পর্যন্ত গিয়ে থেমেছে? আমাদের বাবা মা ( কিছু ক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম) সচরাচার আমাদের সাথে ভালোবাসি কথাটা খুব একটা বলতেন না। তবে আমরা এখন বলি । অবশ্য এতে আমাদের কোন কৃতিত্ব নেই। আমাদের সন্তানেরা হয়তো আরো বেশি কিছু বলতে পারবে।
একবার ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়ে ভুল করে এক বড় ভাইয়ের ক্লাসে ঢুকে পড়েছিলাম। স্পস্ট মনে আছে সে ক্লাসের বড় ভাইয়েরা সেদিন আমাকে কান ধরিয়ে শাস্তি দিয়েছিলেন। প্রাইমারী শেষ করে যখন কেউ হাইস্কুলে যেতো তখন শুনতে হতো প্রাইমারীর গন্ধ নাকি এখোনো শরীর থেকে যায়নি। অবশ্য এসব ঘটনার অনেকগুলো খারাপ আর ভালো দিক ছিলো।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হতো। ফাইনাল মানে ফাইনাল। পুরো বই পড়ে পরীক্ষা দিতে হতো। নতুন কারিকুলাম, সৃজনশীল এসব কিছুই ছিলো না তখন। সিলেবাস কি জিনিস সেটা খুব একটা বুঝতাম না। পরীক্ষার আগেরদিন পুরো বই পড়তে হতো। একবাড়ির পড়া অন্য বাড়ি থেকে শোনা যেতো। আমার পিতামহ একটা কথা বলতেন,
"একে মুনমুন দুইয়ে পাঠ, তিনে গোলমাল চারে হাট" পিতামহের মতে এখনকার শিক্ষার্থীরা হাটেই থাকে।
কিছু সিনিয়র বড় ভাইয়েরা বলতো,
"পড়ালেখা আসলেই মজার যদি না থাকে পরীক্ষা।"
শেষ পরীক্ষার দিন আমরা বলাবলি করতাম, আহ! পরীক্ষার পরে একটানা তিন দিন ঘুমাবো, সারাদিন খেলব, ইত্যাদি। পরীক্ষার পরের দিনই কোথা থেকে যেনো পুরাতন একসেট বই এসে হাজির হতো। পড়তে হতো তবে এতো চাপ নিয়ে নয়। সকালে একটু দেরী করে ঘুম থেকে ওঠা যেতো। বিকেলে বা গভীর রাত পর্যন্ত না পড়লেও চলতো। দেখতে দেখতে ডিসেম্বর চহলে যেতো আবার জানুয়ারি, কনকনে শীত, ঘন কুয়াশা। আবার সেই ঘাস মাড়িয়ে বয়ে চলা। তবে শিশিরে আসতো অনেক পরিবর্তন হাল্কা নয় ঘন শিশিরে ভিজে যেতো দুর্বাঘাস। দুরে রাখালের গরুগুলো ঘাস খেতে খেতে মিলিয়ে যেতো সাদা কুয়াশায় ভীড়ে। ঘন মেঘের মত কুয়াশার সাথে সুর্যের যুদ্ধ চলত অবিরাম। আমরাও পৌঁছে যেতাম স্কুলের আঙিনায়। পিটি স্যারের বাঁশির আওয়াজ যেনো সকল কুয়াশার ভীড় সরিয়ে দিয়ে আমাদের জানিয়ে দিত তোমরা প্রস্তুত হও আগামির পৃথিবী গড়ার নতুন প্রত্যয়ে।
-এম.মাহামুদুল হাসান
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন