নতুন কারিকুলাম ও আমাদের বাস্তবতা

আজকের শিশুকে আগামি দিনের বাংলাদেশ হিসেবে বিনির্মান করতে চাইলে আর নাকে তেল দিয়ে ঘুমালে চলবে না। শিক্ষাখাতে ইনভেস্টমেন্ট এখন কেবলই সময়ের দাবী। জোড়াতালি দেয়া শিক্ষাব্যবস্থা, আবাসন আর নামমাত্র শিক্ষক দিয়ে কোনমতে খুড়িয়ে চললেও বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে নিতে হবে জোর দৌড়ের প্রস্তুতি।

লেখকঃ এম. মাহামুদুল হাসান

সুমনা আক্তার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা বেসরকারী একটি এনজিওতে চাকুরী করেন। বাবার চাকুরীর সুবাদে এ বছর তাকে স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছে। বছরের মাঝামাঝি সে ঢাকা শহরের একটি নামি বেসরকারী স্কুলে ভর্তি হয়েছে। সেখানে সরকারী ৩ (তিন) টি বইয়ের পাশাপাশি পড়তে হচ্ছে সাধারন জ্ঞান, কম্পিউটার, অংকন, পরিবেশ পরিচিতি, বিজ্ঞান এবং ধর্ম। এর আগে যে স্কুলে পড়তো সেখানেও এই বিষয়গুলোর কয়েকটি বিষয় সে পড়েছে। তবে বাধ সাধলো সিলেবাসে। আগের বিদ্যালয়ের অতিরিক্ত বইগুলোতে যে অধ্যায়গুলো ছিল বর্তমানে সে অধ্যায়গুলো নেই। বইগুলোও অন্য প্রকাশনীর। এখানে তাকে নতুন বই কিনতে হয়েছে। উপরোক্ত বইগুলো ছাড়াও বাংলা ও ইংরেজি ২য় পত্র এবং গাইডের নামে এক প্রকাশনীর বই কিনতে বলা হয়েছে যা আগের স্কুলের সাথে মিল নেই।

সরকার প্রতি বছর তার কারিকুলামে এনসিটিবি'র নির্ধারিত বই ছাড়া অন্য বই না দেয়ার কথা স্পস্ট উল্লেখ করে প্রতিটি বিদ্যালয়ে নির্দেশনা জারি করে থাকে । কিন্তু কে শোনে কার কথা? প্রতি বছর ভর্তি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে স্কুল গুলো বাহারী বই নির্বাচনে আদাজল খেয়ে কাজ করে । বছরের শুরুতে যে কোম্পানী ফ্রি বই আর উপঢৌকোন পাঠিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষকে খুশি করতে পারে সে বছর তাদের বইগুলোই পাঠ্যক্রমে স্থান পায় সবার আগে।  ক্ষেত্র বিশেষ দু'একটি বিদ্যালয়কে তার ব্যতিক্রম হতে দেখা যায়। ইদানিং শোনা যাচ্ছে কিছু সরকারী প্রাইমারী বিদ্যালয়েও নাকি এরুপ বই বানিজ্যে অংশ নিচ্ছে। তবে তারা এখানেই ক্ষান্ত নয়। এসব বিদ্যালয়গুলো তাদের নির্ধারিত বই অভিভাবকদের কাছে চড়া দামে বিক্রিও করে থাকে।

দীর্ঘদিন একটি ভ্রান্ত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা পার হচ্ছি। আমাদের না আছে কোন মানদন্ডন,না আছে কোন সুনির্দিষ্ট কারিকুলাম। সব মিলিয়ে একটি জগা খিচুড়ি ব্যবস্থাকে আমরা দিনে দিনে লালন করছি। এ ক্ষেত্রে আমি দায়সাড়া বলে সবাইকে বা সরকারকে দোষ দিতে চাচ্ছি না।  আমি বলছি না, আমাদের সুনির্দিষ্ট কারিকুলাম নেই। বিষয়টা হচ্ছে কারিকুলামের সঠিক প্রয়োগ নেই। বেসরকারী বিদ্যালয়গুলো যেমনি মানছেননা সরকারের নিয়ম তেমনি উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তারা করছেন না এসব অনিয়মের সুস্ঠু তদারকী। তাদের সন্তানদের তারা সরকারী বিদ্যালয়ে ভর্তি রাখলেও অজানা লাভ আর নামের আশায় ক্লাস করান বেসরকারী বিদ্যালয়ে, এমন প্রমান অহরহ। কথায় বলে বিড়ালের গলায় কে বাঁধবে। বেসরকারী বিদ্যালয়ের জমকালো অনুষ্ঠানসমূহে প্রধান অতিথি হবার এবং চাহিদা মোতাবেক গিফ্ট পাবার আশায় এমন কর্মকর্তাদের অনেকেই সাদাকে কালো আর কালোকে সাদা বলে থাকেন। খোঁজ নিয়ে জানা যাবে এসকল প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই সঠিক নিয়ম মেনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন কিংবা পাঠদানের অনুমতি প্রাপ্ত হয়নি। বছরের শুরুতে নগদ টাকার বিনিময়ে বই গ্রহণ আর বিতরণের মত গুরুতর অন্যায়ের সাথেও এরা নিযুক্ত হচ্ছে বছরের পর বছর। 

সরকার নতুন কারিকুলাম নামে একটি কারিকুলাম বাস্তবায়নে বেশ তোরজোর চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু অসাধু নোট গাইড বিক্রেতা, কিছু কোচিং সেন্টার বা অনুমোদন বিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর ঘোর বিরোধিতা করে যাচ্ছে। এর সাথে সুর মিলাচ্ছে কিছু শিক্ষা ব্যবসায়ী আর ভ্রান্ত ধারার রাজনীতিক। দেশের নামীদামী কিছু প্রতিষ্ঠানের দু'একজন শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের ভুল বুঝিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুল তথ্য আর গুজব ছড়িয়ে শিক্ষাব্যাবস্থাকে বিপাকে ফেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে তারা। 

শিশু বয়সে এমন সুমনা আক্তাররা শিক্ষাব্যবস্থার যাতাকলে পড়ে লেখাপড়াকে একটি ভীতিপ্রদ কাজ হিসেবে ধরে নিচ্ছে। তাদের অপ্রকাশিত মেধা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে। সরকারকে এর আশু ব্যবস্থা গ্রহণে অনতিবিলম্বে তৎপর হওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প পথ নেই। এই লেখা পড়বেন এমন শীর্ষ পর্যায়ের মানুষ এখানে রয়েছেন। হয়তো আমলাতন্ত্র আর দায়িত্ববোধের কঠিন চাপে তারা এসব মাঠ পর্যায়ের বিষয় নিয়ে খুব সামান্যই অনুধাবন করে থাকবেন। তবে এ নিয়ে ভাবাটা আমাদের অতি আবশ্যকীয় কাজ হয়ে গিয়েছে। আজকের শিশুকে আগামি দিনের বাংলাদেশ হিসেবে বিনির্মান করতে চাইলে আর নাকে তেল দিয়ে ঘুমালে চলবে না। শিক্ষাখাতে ইনভেস্টমেন্ট এখন কেবলই সময়ের দাবী। জোড়াতালি দেয়া শিক্ষাব্যবস্থা, আবাসন আর নামমাত্র শিক্ষক দিয়ে কোনমতে খুড়িয়ে চললেও বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে নিতে হবে জোর দৌড়ের প্রস্তুতি। রস মাখানো কথা আর হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা করে কখোনোই বিশ্বমানের মানুষ তৈরী করা সম্ভব নয়। তাই সকলের প্রতি আহ্বান, আসুন প্রত্যেকে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে সৎ থেকে আমার সোনার বাংলাকে একটি পরিকল্পিত, সুখি বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলি।

এম.মাহামুদুল হাসান

সদস্য, খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটি

আরও পড়ুনঃ https://hawaimethai.blogspot.com/2023/11/blog-post.html?m=1

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যুদ্ধ নয় শান্তি চাই, শিশুর বাসযোগ্য পৃথিবী চাই

বৃত্তি পরীক্ষা ও শিশুর অধিকার: বৈষম্যের বিপরীতে যুক্তির ভাষা

বাংলা ছড়া : তানজিলা কাওছার